সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সাত বছর 


নিজস্ব প্রতিবেদক: | Published: 2019-02-11 09:15:28 BdST | Updated: 2019-07-20 09:10:41 BdST

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনিকে যেন ভুলেই গেছে সবাই। সাত বছর পার হয়ে গেলেও তাদের হত্যারহস্যের কোনো কূলকিনারা হয়নি। তোলপাড় হওয়া হত্যাকা-ের তদন্তের পর তদন্ত হয়েছে, দাফন হওয়া লাশ তোলা হয়েছে কবর থেকে, উচ্চ আদালত থেকে এসেছে একের পর এক আদেশ। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। শুধু প্রতিবেদনের নামে বান্ডিলে বান্ডিলে কাগজ জমা দিয়ে গেছে একের পর এক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আসামি গ্রেফতার তো দূরের কথা, মোটিভও উদ্ধার করতে পারেনি কোনো সংস্থা। অথচ এই হত্যাকান্ড- কাঁদিয়েছিল সাধারণ মানুষকে, আলোড়ন তুলেছিল ঘরে ঘরে। বাংলাদেশে এভাবে একটি নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডের কূলকিনারা না হওয়া নজিরবিহীন। সাগর-রুনীর ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে উত্তীর্ণ হলেও আদালতে ৬৩ বার সময় নেওয়া র‌্যাবের বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তার মুখে কুলুপ।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনী নিজেদের ভাড়া বাসায় খুন হন। পরদিন ভোরে তাদের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার হয়। ঘটনার সময় বাসায় থাকা তাদের একমাত্র শিশুসন্তান সাড়ে পাঁচ বছর বয়সী মাহির সরওয়ার মেঘ বেঁচে যায়। হত্যাকাে র পরদিন মামলা করেন রুনীর ভাই নওশের আলম রোমান। মামলাটি প্রথমে তদন্ত করেন শেরেবাংলা নগর থানার এসআই জহুরুল ইসলাম। তার কাছ থেকে তদন্তের দায়িত্ব গিয়েছিল ডিবির পরিদর্শক রবিউল আলমের কাছে। ৬২ দিন পর ডিবি আদালতের কাছে ব্যর্থতা স্বীকার করলে তদন্তের দায়িত্বে আসে র‌্যাব। এরপর র‌্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তার হাত ঘুরে তদন্তভার আসে এএসপি শহিদারের কাছে। আদালতের আদেশ অনুসারে আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমার দেওয়ার দিনক্ষণ নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু এবারও কোনো আশার আলো নেই। সময় নেওয়া যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আর তদন্ত সংস্থা এবারও একই পথে হাঁটছে।

জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা এএসপি শহিদার সাংবাদিকদের বলেন, ময়নাতদন্ত, ডিএনএ পরীক্ষাসহ তদন্তের প্রয়োজনে যেসব পরীক্ষা করা হয়েছিল, সবগুলোর ফলাফল তারা পেয়েছেন। বিদেশে করা পরীক্ষার ফলাফলও তাদের হাতে এসেছে। এসব পরীক্ষায় কী ফলাফল পাওয়া গেছে- জানতে চাইলে ‘তদন্তের স্বার্থে’ কিছু বলতে রাজি হননি এই র‌্যাব কর্মকর্তা। অভিযোগপত্র কবে নাগাদ দিতে পারবেন- এমন প্রশ্নে তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। চার্জশিট দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট করে দিনক্ষণ বলার সুযোগ নেই। সময় হলে চার্জশিট দেওয়া হবে।

জানা যায়, এখন পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে একের পর এক তদন্ত কর্মকর্তা দায়িত্বে এসেও কোনো আসামিকেই সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত বা আটক করতে পারেনি। এর মধ্যে কেন ওই সাংবাদিক দম্পতি খুন হয়েছে তার ‘মোটিভ’ও এখনো অজানা। তা জানতে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন হওয়া দুজনের লাশ তুলে ‘ভিসেরা’ (রাসায়নিক) পরীক্ষা এবং ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ‘ফরেনসিক’ পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণাগারে পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ তাদের তদন্ত। তবে সূত্রের খবর, যুক্তরাষ্ট্রে যে আলামত পাঠানো হয়েছিল, তা থেকে কারও পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া যায়নি। কারণ ঢাকা থেকে যে ২১ সন্দেহভাজনের ডিএনএ নমুনা আলামতের নমুনার সঙ্গে মেলানোর জন্য পাঠানো হয়েছিল, তাদের কারও নমুনাই আলামতের ডিএনএর সঙ্গে মেলেনি। অর্থাৎ এখনো খুনিকে সন্দেহের মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তারা আনেননি বা আনা সম্ভব হয়নি। তবে এ মামলায় সন্দেহজনক গ্রেফতার আটজনের মধ্যে দুজন বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। রুনীর কথিত বন্ধু তানভীর রহমান ও বাড়ির দারোয়ান পলাশ রুদ্র পাল জামিন পেয়েছেন। তবে রান্নাঘরের গ্রিল কেটে কথিত ডাকাতির অভিযোগে এখনো কারাগারে রয়েছেন রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মিন্টু ওরফে বারগিরা মিন্টু ওরফে মাসুম মিন্টু, কামরুল হাসান অরুণ, আবু সাঈদ এবং ওই বাড়ির নিরাপত্তারক্ষী এনাম আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবির। আসামিদের প্রত্যেককে একাধিবার রিমান্ডে নেওয়া হলেও তাদের মধ্যে কেউ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি।

সাগর-রুনী হত্যার বিচারের দাবিতে বিভিন্ন সময় রাস্তায় নামা সাংবাদিকদের মতে, অতীতে সময় নিয়ে হলেও হত্যারহস্য উদঘাটন হয়েছে। কিন্তু সাগর-রুনীর ক্ষেত্রে না হওয়ায় সাধারণভাবে দুটো বিষয় সামনে আসে। এর একটি হলো, যারা তদন্তকারী সংস্থা তারা অত্যন্ত অদক্ষ। আরেকটি কারণ হতে পারে, সরকার চায় না অথবা এর পেছনে হয়তো বড় কেউ রয়েছে, যার জন্য তদন্তে কোনো অগ্রগতি দেখানো হচ্ছে না। অবশ্য র‌্যাবকে অদক্ষ মানতে নারাজ সাংবাদিকরা এখন হত্যারহস্য উদঘাটন নিয়েই সন্দিহান।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।