মশা মারতে দায়িত্ব নিয়েই নামতে হবে


বিশেষ সংবাদদাতা | Published: 2020-02-05 10:28:40 BdST | Updated: 2020-02-17 19:02:52 BdST

ঢাকার দুই মেয়র আতিকুল ইসলাম ও ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। ছবি : সংগৃহীত

হাজারো সংকটের আবর্তে রাজধানী শহর ঢাকা। বিভিন্ন সময় ঢাকা সিটি করপোরেশনে দায়িত্ব পালন করা মেয়ররা নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবায়ন হয়েছে খুব কমই। ফলে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন নির্বাচিত মেয়রদের সামনে এখন সমস্যা আর সংকটের পাহাড়। মশার উপদ্রব, যানজট, জলাবদ্ধতা, অপরিচ্ছন্নতা, অপ্রতুল গণপরিসরের মতো এ নগরীর চিরচেনা সমস্যার সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে ব্যাপক পরিবেশদূষণ।

বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীর তালিকায় শীর্ষে নিয়মিতই ঠাঁই পাচ্ছে ঢাকা। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব সমস্যা সমাধান করে একটি স্বাস্থ্যসম্মত নগরী গড়াই নতুন মেয়রদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য তারা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে সদিচ্ছা নিয়ে কাজ করা এবং নগরীর বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

রাজধানীতে মশার উপদ্রব সব সময় থাকলেও গত বছর মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া ডেঙ্গু নগর কর্তৃপক্ষ ছাড়িয়ে সরকারেরও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ বছরও মশাবাহিত রোগ নিয়ে নাগরিকদের উদ্বেগ ও সজাগ দৃষ্টি থাকবে। ফলে তা মেয়রদের কার্যতালিকায় প্রধান ও প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মশা দমনে শুধু কার্যকর ওষুধ আমদানি ও যথাযথভাবে ছিটানোই নয়, এর সঙ্গে জড়িত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, জলাবদ্ধতা দূর করা ও জনগণকে সচেতন করার মতো বিষয়ও।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির মেয়ররা তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ঢাকাকে বিশ্বমানের নগরী হিসেবে গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেয়রপ্রার্থীরা নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও সব তাদের এখতিয়ারে নেই। এ ছাড়া ঢাকা শহরের উন্নয়নে ৫২টি সংস্থা জড়িত। সবগুলো সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে উন্নয়নকাজ এগিয়ে নিতে হয়। তারা বলছেন, সিটি মেয়রদের কার্যপরিধি কম হলেও অন্য সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে নগরবাসীর জন্য অনেক কাজ করা সম্ভব। এ মুহূর্তে রাজধানীবাসীর প্রধান চাওয়া মশকমুক্ত ঢাকা। এর বাইরে সবুজ ঢাকা গড়ার লক্ষ্যে বেদখল হয়ে যাওয়া খেলার মাঠ উদ্ধার ও নতুন মাঠ তৈরি, পার্কের উন্নয়ন, বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে দূষণমুক্ত বাসযোগ্য ঢাকা গড়া, উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে গতিবৃদ্ধি, কমিশন বাণিজ্য বন্ধ, চিকিৎসাসেবার সহজলভ্যতা ও পাঠাগারের কার্যক্রম বৃদ্ধি, বেদখল হয়ে যাওয়া কমিউনিটি সেন্টারগুলো দখলমুক্ত করা, নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন ঢাকা গড়ার মতো কাজও করতে হবে মেয়রদের।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক নগর পরিকল্পনবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, অনেকে বলেন মেয়রদের ক্ষমতা কম। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মেয়রদের অনেক ক্ষমতা দেওয়া থাকলেও বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট নেই। একই সঙ্গে এই ক্ষমতা চর্চা করার জন্য যে সরকারি সহযোগিতা দরকার তা তারা পান না।

তিনি বলেন, ঢাকা শহরের যানজট ও জলজট মোকাবিলাই নতুন মেয়রদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। তবে এর সমাধান মেয়রদের একার পক্ষে সমাধান সম্ভব নয়। এ জন্য এলাকাভিত্তিক উদ্যোগ দরকার। বেদখল হয়ে যাওয়া খালগুলো উদ্ধারে স্থানীয় কাউন্সিলর ও বাসিন্দাদের সমন্বয় করে কার্যক্রম হাতে নিতে হবে।

ড. আদিল বলেন, এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়ে রাস্তা সংস্কার, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেন ও খাল উদ্ধার, অবৈধ দখল উচ্ছেদসহ নানা কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। এ ছাড়া রাজধানীজুড়ে থাকা অবৈধ শিল্প-কারখানা ও গুদামগুলো সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি মশক নিধনে উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। তিনি আরও বলেন, মশা দমনে কেবল মশার মৌসুমের জন্য অপেক্ষা না করে এখনই এলাকাভিত্তিক বছরব্যাপী পরিকল্পনা নেওয়া দরকার। এতে মশা দমনের পাশাপাশি এলাকাগুলোও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে।

সুস্থ, সচল ও আধুনিক ঢাকা গড়তে ‘ত্রিমুখী’ ইশতেহারে ৩৮টি প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছিলেন উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম। দক্ষিণের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস পাঁচ দফা রূপরেখায় ৩০ বছরের মহাপরিকল্পনার ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন। দুই মেয়রের দায়িত্ব নিতে আরও অন্তত দুমাস সময় লাগবে। সেই সময়টাই মশার প্রাদুর্ভাবকাল হিসেবে দেখা দেবে।

গত বছর মার্চের শেষ থেকে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব শুরু হয়ে চলে নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত। তা ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী। সরকারি হিসাবেই ১৬৬ জনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। ডেঙ্গুকে শুরুতে গুরুত্ব না দেওয়ার পাশাপাশি মশার ওষুধ ক্রয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। এবার যেন তেমনটি না হয় সেটিই নতুন মেয়রদের কাছে নগরবাসীর বড় চাওয়া।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, মশক নিধন নতুন মেয়রদের কাছে একটি চ্যালেঞ্জ। তবে মশা নির্মূল হঠাৎ করে সম্ভব নয়। গত বছর জানুয়ারি মাসে যে সংখ্যক ডেঙ্গু রোগী ছিল, এ বছরের জানুয়ারি মাসে কিন্তু সেই তুলনায় ডেঙ্গু রোগী অনেক বেশি। এটি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বছরব্যাপী পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজ করতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত চারজন কর্মীকে ডেঙ্গু নিধনে কাজে লাগাতে হবে। যারা প্রতিমাসে মেয়র বরাবর রিপোর্ট দেবেন। তিনি আরও বলেন, কেবল ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণই নয়, আরবান প্ল্যানিং, বর্জ ব্যবস্থাপনাসহ সব কাজের ক্ষেত্রেই বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে পরিকল্পনা করে কাজ করলে অনেকাংশেই সুফল আসবে।

ঢাকার দুই সিটিতে ২০১৭ সালে যুক্ত হয় নতুন ৩৬টি ওয়ার্ড। এসব ওয়ার্ড সিটি করপোরেশনে যুক্ত হলেও তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। পৌঁছেনি কোনো নাগরিক সেবা। সব কিছু কেবল প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ। এবার নির্বাচনে সব মেয়রপ্রার্থীই এই ওয়ার্ডগুলো নিয়ে আশার কথা শুনিয়েছেন।

নগর পরিকল্পনা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিটি করপোরেশনের নিজস্ব আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়া, জবাবদিহিতা নিশ্চিত, বিনোদনের ব্যবস্থা, ইচ্ছেমতো রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ, যাত্রী ছাউনি ও পর্যাপ্ত টয়লেট নির্মাণ, ফুটপাত দখলমুক্ত ও হলিডে মার্কেট স্থাপন, নানা কারণে ঝুঁকিতে থাকা পুরান ঢাকাকে নিরাপদ করা, অপরাধ দমনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, বাসা ভাড়া নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা রোধ ও বাজার মনিটরিং প্রভৃতি কাজ গুরুত্ব দিয়েই করতে হবে।

ঢাকা দক্ষিণের নবনির্বাচিত মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, দায়িত্বভার গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে আমরা কাজ শুরু করব। ঢাকাবাসীর প্রত্যাশিত ও কাক্সিক্ষত ঢাকা উপহার দেব। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করব। তিনি বলেন, আমি সবাইকে নিয়েই কাজ করতে চাই। নগর ভবনের দরজা সবার জন্য খোলা থাকবে। প্রথম ৯০ দিনের মধ্যেই প্রথম মৌলিক নাগরিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করব।

ঢাকা উত্তরের নবনির্বাচিত মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন খাতে বিশেষজ্ঞ যারা আছেন, তাদের নিয়ে নগরীর সমস্যা দূর করতে কাজ করব। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করতে চাই। উত্তর সিটিতে যুক্ত নতুন ১৮টি ওয়ার্ড নিয়ে কাজ করা হবে বলেও জানান তিনি।

সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, শহরকে স্বাস্থ্যসম্মত রাখাটাই নতুন মেয়রদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে আসন্ন মৌসুমে মশার প্রাদুর্ভাব নিয়ে ভাবার বিষয় রয়েছে। মশার মৌসুম শেষেই বর্ষাকাল চলে আসবে। জলাবদ্ধতা নিরসনেও সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। বেদখল হয়ে যাওয়া খালগুলো উদ্ধারে সদিচ্ছার সঙ্গে কাজ করতে হবে। এ ছাড়া পরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, শিশু-নারী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য নিরাপদ শহর গড়ার ক্ষেত্রেও তাদের চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। তিনি বলেন, সুশাসন তৈরিতেও নগর মেয়রদের কাজ করতে হবে। সব ধরনের উন্নয়নকাজে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।