খালেদার মুক্তির আশা দেখছে না বিএনপি


নিজস্ব প্রতিবেদক: | Published: 2020-02-08 10:24:24 BdST | Updated: 2020-02-17 20:01:52 BdST

ফাইল ছবি

কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির আশা ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। আইনি প্রক্রিয়ায় তার জামিনে মুক্তির কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না দলটির নেতারা। আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে চাপে ফেলে তাকে মুক্ত করার মতো সাংগঠনিক সক্ষমতাও নেই। এ অবস্থায় দলটির নীতিনির্ধারকসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মনোবলেও বেশ ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

এদিকে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে তার পরিবার ও দলে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিবারের সদস্যরা খালেদা জিয়ার ‘জীবন রক্ষার্থে’ রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করার বিষয়ে ভাবছেন। খালেদা জিয়া এতে রাজি হলেই আবেদন করা হবে।

পরিবারের সদস্যরা ও দলের একটি অংশ মনে করে, খালেদা জিয়ার সব শেষ জামিন আবেদন আপিল বিভাগ খারিজ করে দিলে আইনি পথে তার মুক্তির পথ বন্ধ হয়ে যায়। এর পর গত ২৪ জানুয়ারি বিএসএমএমইউতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন তার সেজো বোন সেলিমা ইসলামসহ স্বজনরা। বোনের মুক্তির বিষয়ে নতুন করে আবেদন করার কথা জানিয়ে সেলিমা ইসলাম সেদিন সাংবাদিকদের বলেন, আমরা ভাবছি আবেদন করব। কারণ তার শরীরের যে অবস্থা, এভাবে চলতে থাকলে ওনাকে জীবিত অবস্থায় বাসায় নিয়ে যেতে পারব না।

জানা গেছে, সম্প্রতি পরিবারের সদস্যরা খালেদা জিয়ার ‘জীবন রক্ষার্থে’ রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করার বিষয়টি নিয়ে নিজেরা বসেছিলেন। এ নিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গেও তারা আলোচনা করবেন। খালেদা জিয়ার সঙ্গেও দেখা করবেন। তিনি রাজি হলেই আবেদন করা হবে। তবে এর আগে একবার প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি দল ও পরিবারের দিক থেকে খালেদা জিয়ার কাছে তুলে ধরা হয়েছিল। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে তা নাকচ করে বলেছিলেন, ‘আমি কোনো অন্যায় করিনি।’

রাষ্ট্রপতির কাছে বিশেষ আবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য বলেন, এটি দলীয় নয়, পারিবারিক বিষয়। তবে তারা জানান, ধীরে ধীরে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। এর মধ্য দিয়ে সরকারকে চাপে ফেলে খালেদা জিয়ার মুক্তির চেষ্টা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি।

নানামুখী এই চিন্তাভাবনার মধ্যেই আজ খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্বের দুই বছর পূর্তি হচ্ছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রæয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসনকে কারাগারে পাঠান ঢাকার একটি আদালত। দুই বছরপূর্তিতে তার মুক্তির দাবিতে আজ শনিবার নয়াপল্টনে সমাবেশ করবে বিএনপি। এ ছাড়া তার রোগমুক্তি কামনায় গতকাল শুক্রবার বাদ জুমা মসজিদে মসজিদে বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়।

খালেদা জিয়ার মামলা ও মুক্তি প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দেশনেত্রীকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে, বেআইনিভাবে বিচারব্যবস্থাকে করায়ত্ত করে মিথ্যা ও বানোয়াট মামলায় সাজা দেওয়া হয়েছে। এখন তাকে তার সাংবিধানিকভাবে প্রাপ্য জামিনও দিচ্ছে না। আমরা বারবার আদালতে গিয়েছি কিন্তু সেটা কী হয়েছে আপনারা সবই জানেন, দেখছেন। আমরা তার মুক্তির জন্য আন্দোলনের মধ্যে আছি, আন্দোলন করছি।

বিএনপির একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য ও একজন ভাইস চেয়ারম্যানের সঙ্গেও এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তাদের দাবি, দেশের সাধারণ মানুষও বুঝতে পেরেছে খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই কারাগারে নেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় বিএনপি যদি রাজনৈতিকভাবে সফল না হয়, তা হলে সরকার খালেদা জিয়াকে ছাড়বে না- এটাই স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক হিসাবটা দলের নীতিনির্ধারকরা বুঝতে অনেক দেরি করে ফেলেছেন।

ওই দুই নেতা বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে সরকারের সঙ্গে দরকষাকষি করা হলে একটা সম্ভাবনা ছিল। বিএনপির নির্বাচিত এমপিরা শপথ নেওয়ার আগেও দরকষাকষি করলে হয়তো সম্ভাবনা ছিল। দলের নীতিনির্ধারকরা হাতে থাকা কোনো অস্ত্রই কাজে লাগাতে পারেননি। পুরো বিষয়টিই রাজনৈতিক ব্যর্থতা। এ অবস্থায় উচ্চ আদালতে খালেদা জিয়ার জামিন না হওয়ায় আইনি প্রক্রিয়ায় তার মুক্তির সুযোগ অনেকটা শেষ হয়ে যায় বলে মনে করেন ওই দুই নেতা।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বিচার বিভাগে সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন হচ্ছে। তাই জামিন আবেদন করেও কোনো কাজ হচ্ছে না। এদিকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার জীবন বাঁচাতে সুচিকিৎসা দরকার। এ ক্ষেত্রে মানবিক কারণে তিনবারের এই প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সরকারেরও একটি দায়িত্ব রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা অনুযায়ী সাজা স্থগিত করে তাকে মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা সরকারের রয়েছে। আমরা সব শেষ তার সাজা স্থগিত করে বিদেশে সুচিকিৎসার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছি। কিন্তু সরকারের তরফে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

নির্জন ‘ফিরোজা’

গুলশানে খালেদা জিয়ার ভাড়া করা বাসভবনের নাম ‘ফিরোজা’। গুলশান অ্যাভিনিউর ৭৯ নম্বর সড়কের প্রথম বাড়ি এটি। ২০১৮ সালে ৭ ফেব্রæয়ারিতেও নেতাকর্মীতে সরগরম ছিল বাড়ির সামনের সড়কে। এখন ৪ জন নিরাপত্তাকর্মী পাহারা দেন শূন্য বাড়িটি। একজন নিরাপত্তাকর্মী জানান, এখন এই বাসায় কেউই থাকেন না। গ্যাস ও টেলিফোন লাইন বন্ধ বহুদিন ধরে। জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি ও তার দুই মেয়ে লন্ডন থেকে এসে ১২ দিন বাড়িটিতে থেকেছিলেন। ৫ ফেব্রুয়ারি তারা লন্ডন ফিরে যান।

খালেদা জিয়ার মামলার সব শেষ অবস্থা

বিএনপির আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, দায়ের হওয়া ৩৭টি মামলার মধ্যে ৩৫টিতেই জামিনে রয়েছেন চেয়ারপারসন। এখন তার কারামুক্তির জন্য দণ্ডপ্রাপ্ত দুটি মামলায় জামিন প্রয়োজন। জানা গেছে, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় জামিন আবেদন গত ১২ ডিসেম্বর খারিজ করে দেন আপিল বিভাগ।

এখন এ আদেশ পুনর্বিবেচনা চেয়ে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। অথবা এ মামলায় সাত বছরের দণ্ডের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যে আপিল বিচারাধীন রয়েছে, তা নিষ্পত্তি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এ ছাড়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজা বৃদ্ধি করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে খালেদা জিয়ার করা আপিল বিচারাধীন রয়েছে। ওই আপিলের সঙ্গে জামিনের আবেদনও রয়েছে।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৩৭ মামলার মধ্যে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের ৫টি এবং বাকিগুলো বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে হয়। নাইকো, গ্যাটকো ও বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি এবং যানবাহনে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা, সহিংসতা, নাশকতা, রাষ্ট্রদ্রোহ, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কটূক্তি ও ভুয়া জন্মদিন পালনের অভিযোগে এসব মামলা হয়।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।