দেড় যুগ পর বিএনপির দুর্গ শূন্য


জেলা সংবাদদাতা: | Published: 2018-12-19 18:09:23 BdST | Updated: 2019-07-24 08:34:45 BdST

নির্বাচন কমিশন বৈধ প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেয়ার পরও নির্বাচনী প্রচারণার মাঝামাঝি এসে উচ্চ আদালতের আদেশে বগুড়ার গুরুত্বপূর্ণ দুটি আসনে বিএনপির প্রার্থীদের অংশগ্রহণ আটকে গেছে।

এতে বগুড়ার দুটি আসন বিএনপির প্রার্থী শূন্য হয়ে গেল। আসনগুলো হলো- বগুড়া-৩ (আদমদীঘি ও দুপচাঁচিয়া) এবং বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর)। এ দুই আসনে ধানের শীষ প্রতীকের দুইজনের প্রার্থিতা স্থগিত করা হয়।

আসন দুটি দেড় যুগ ধরে বিএনপির দখলে ছিল। দুটি আসন বিএনপির দুর্গ হিসেবে খ্যাত। এর মধ্যে বগুড়া-৭ আসনটি হলো প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান।

অন্যদিকে এবার এ দুই আসনে মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টিকে (জাপা) ছেড়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এ কারণে আসন দুটিতে নৌকার একক প্রার্থী নেই। অন্য চারজন প্রার্থী থাকলেও এখানের ভোটারদের তথ্যমতে, অনেকটা ফাঁকা মাঠে গোল দিতে যাচ্ছে জাপা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বগুড়া-৩ আসনে প্রার্থিতা ফিরে পেতে আবদুল মুহিত তালুকদার হাইকোর্টে রিট করেন। এরপর গত ৯ ডিসেম্বর তার মনোনয়নপত্র গ্রহণ করতে ইসিতে নির্দেশ আসে। এই আদেশ স্থগিত চেয়ে ইসি আবেদন করে আপিল বিভাগে। শুনানি নিয়ে ১১ ডিসেম্বর চেম্বার বিচারপতি হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে বিষয়টি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান। এরপর আপিল বিভাগ চেম্বার বিচারপতির দেয়া স্থগিতাদেশ বহাল রাখে।

আবার ভিন্ন অভিযোগে বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনে বিএনপির এই প্রার্থীর প্রার্থিতাও বাতিল করেছে হাইকোর্ট। এ সংক্রান্ত এক রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি খায়রুল আলমের বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক। তার সঙ্গে ছিলেন সেলিনা আক্তার। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিকল্প প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন মিলটন। কিন্তু উপজেলা চেয়ারম্যান থেকে পদত্যাগ না করায় তার মনোনয়ন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। পরে আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পান নির্বাচন কমিশন থেকে। তবে উপজেলা চেয়ারম্যান থেকে পদত্যাগ সঠিকভাবে হয়নি দাবি তুলে রিট করেন এ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ফেরদৌস আরা খান।

স্থানীয় ভোটাররা বলেন, এমনিতে দুই আসনে নৌকার প্রার্থী নেই। এরপর আবার প্রচারণার মাঝামাঝি এসে মাঠ ছাড়তে হচ্ছে ধানের শীষের প্রার্থীদের। এখন লাঙলের প্রার্থীর সঙ্গে স্বতন্ত্রসহ অন্য প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। স্বাভাবিক কারণে ভোটের মূল আমেজ কমে গেলো।

সোমবার ধানের শীষের জমজমাট প্রচারণায় মুখর ছিল বগুড়া-৭ নির্বাচনী এলাকা। এ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ও গাবতলী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোরশেদ মিলটন ধানের শীষে ভোট চেয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন। ধানের শীষের প্রচারণায় সরগরম ছিল ভোটের মাঠ।

মোরশেদ মিলটনের বিরুদ্ধে রিট আবেদনকারী ফোরদৌস আরা গাতবলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ এইচ আজম খানের স্ত্রী। এবার এ আসনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মহাজোটের প্রার্থী জাপার বর্তমান এমপি আলতাফ আলী।

গাবতলী উপজেলায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের জন্ম। এ কারণে বগুড়া-৭ ‘জিয়া পরিবারের আসন’ হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত এ আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

২০১৪ সালে ‘একতরফা’ নির্বাচনে জেপির (মঞ্জু) এটিএম আমিনুল ইসলামকে হারিয়ে এমপি হন জাপার আলতাফ আলী। তিনি ভোট পান ১৭ হাজার ৮৭৯। এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২১ হাজার ৯৬৯।

এবার এ আসনে খালেদা জিয়ার মনোনয়ন বাতিল হলে দলীয় প্রার্থী হন মোরশেদ মিলটন। ভোটের মাঠে লড়াইয়ের জন্য তিনি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

মোরশেদ মিলটন বলেন, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করে প্রার্থী হয়েছিলাম। এখন পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করার অজুহাত তুলে প্রার্থিতা আটকে দেয়া হচ্ছে। সরকারের এ রকম হুটহাট সিদ্ধান্তের কারণে বিএনপির নেতাকর্মীদের মনোবল হারিয়ে যাচ্ছে। এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছি আমরা।

ধানের শীষের প্রার্থী শূন্যের একই চিত্র বগুড়া-৩ (আদমদীঘি-দুপচাঁচিয়া) আসনেও। এখানে প্রথমে বিএনপি থেকে ধানের শীষের প্রাথমিকভাবে মনোনয়নের চিঠি দেয়া হয় বিএনপির সাবেক এমপি ও মানবতাবিরোধী মামলায় পলাতক আসামি আবদুল মোমিন তালুকদার, তার স্ত্রী মাছুদা মোমিন ও ভাই আবদুল মোহিত তালুকদারকে।

বাছাইয়ের সময় উপজেলা পরিষদের পদ থেকে পদত্যাগ না করায় বাতিল হয় মোহিতের মনোনয়নপত্র। মোনিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থাকায় দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয় মাছুদাকে। পরে হাইকোর্ট আদেশ দেন, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা পদে থেকে নির্বাচন করতে পারবেন। শেষ মুহূর্তে এসে বিএনপির দলীয় প্রার্থী করা হয় আবদুল মোহিত তালুকদারকে। পরে আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। এতে আবারও আটকে যায় আবদুল মোহিতের নির্বাচন করার বিষয়টি।

১৯৯১ সাল থেকে আসনটি বিএনপির দখলে ছিল। ২০০৮ সালে ধানের শীষ নিয়ে এমপি হন আবদুল মোমিন। ২০১৪ সালে ‘একতরফা’ ভোটে সমঝোতার ভিত্তিতে আসনটি জাপাকে ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ।

ফলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হন জাপার নুরুল ইসলাম তালুকদার। এ আসনে মোট ভোটার ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪২৪ জন। এবারও এ আসনে মহাজোটের প্রার্থী হয়েছেন নুরুল ইসলাম।

দুপচাঁচিয়ার গুনাহারা ইউনিয়নের আব্দুল মালিক, আদমদীঘি উপজেলার শিবপুর গ্রামের রমজান আলীসহ অনেকেই বলেন, প্রধান দুই দলের প্রার্থী মাঠে না থাকলে জাতীয় নির্বাচন মনে হচ্ছে না। প্রধান দুই দল নির্বাচনে না থাকলে উৎসাহ থাকে না।

আবদুল মোহিত তালুকদার বলেন, আমার প্রার্থিতা আটকে দেয়াটা সরকারের জুলুম নির্যাতনের নতুন খেলা। আপিলের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন দাখিলের প্রস্তুতি নিচ্ছি।

শাজাহানপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবুল বাশার জানান, উচ্চ আদালতের দেয়া আদেশের বিপরীতে আপিল করতে মোরশেদ মিল্টন বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন। আতঙ্কের কিছু নেই। আগামী সপ্তাহের মধ্যে সুরাহা হয়ে যাবে।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।