42759

01/12/2026 সহনশীলতা বজায় রেখে স্থিতিশীলতার পথে বাংলাদেশের অর্থনীতি

সহনশীলতা বজায় রেখে স্থিতিশীলতার পথে বাংলাদেশের অর্থনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

১১ জানুয়ারী ২০২৬ ১৫:৪৭

অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বিগত সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে একটি চ্যালেঞ্জিং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পাওয়ার পরও বাংলাদেশের অর্থনীতি সহনশীলতা দেখিয়েছে এবং ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা একটি ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পেয়েছিলাম, কিন্তু এখন ম্যাক্রো অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা এসেছে। মূল্যস্ফীতি বেড়েছে; বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কিন্তু শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে এটিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; সরবরাহ পর্যায়ে ব্যবস্থাপনা ও বাজারে শৃঙ্খলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত মুনাফালোভ ও মজুতদারি শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে দমন করা যায় না— এ জন্য পাইকার, ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতাদের সহযোগিতা প্রয়োজন।’

শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘ব্যাংকিং অ্যালম্যানাক’- এর সপ্তম সংস্করণের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে অর্থ উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।

অর্থ উপদেষ্টা নীতিনির্ধারক, বিশ্লেষক ও গণমাধ্যমের প্রতি সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের অর্জন ও চ্যালেঞ্জগুলোকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে উপস্থাপনের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, অব্যাহত সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী ও সম্মানজনক অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ব্যাংকিং অ্যালম্যানাকের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ জিয়াউদ্দিন আহমেদ এবং প্রকল্প পরিচালক আবদার রহমান বইটির পরিচিতি তুলে ধরেন।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ব্যাংকিং অ্যালম্যানাকের বোর্ড অব এডিটরসের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। ধন্যবাদ জানান ব্যাংকিং অ্যালম্যানাকের নির্বাহী সম্পাদক মোহাম্মদ এমদাদুল হক।

এছাড়া বক্তব্য রাখেন বোর্ড অব এডিটরসের সদস্য ও অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ লিমিটেডের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন এবং এইচএসবিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব উর রহমান।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত, প্রভিশনিং, ঋণ প্রবৃদ্ধি, সঞ্চিত মুনাফা ও ঋণ-আমানত অনুপাতসহ ব্যাংকিং খাতের গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো বিদ্যমান চাপ ও চলমান সমন্বয়ের চিত্র তুলে ধরে।

তিনি বলেন, ২০১০ সালের মত আগের সময়ের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিস্থিতি এখনও বেশ চ্যালেঞ্জিং। তবে তথ্য-উপাত্ত ইঙ্গিত দেয় যে সংশোধনী পদক্ষেপগুলো ধীরে ধীরে কার্যকর হচ্ছে। ঋণ প্রবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রিত হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি ব্যাংকে ঝুঁকি শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও উন্নতি হয়েছে।

বিশ্বস্ত আর্থিক তথ্যের সঠিক প্রচারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সম্পূর্ণ তথ্যভাণ্ডার প্রকাশের পরিবর্তে প্রাসঙ্গিক সূচক বাছাই করে উপস্থাপন করলে ব্যাংকিং খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতির প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ সম্ভব হয়।

তিনি বলেন, এসব তথ্যের দায়িত্বশীল ব্যবহার ভুল তথ্য প্রতিরোধে সহায়ক হবে এবং জনসাধারণের বোঝাপড়া জোরদার করবে।

মুদ্রানীতির বিষয়ে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, সুদের হার কমানো একটি জটিল প্রক্রিয়া, যেখানে ট্রেজারি বিলের সুদহার, ব্যাংক আমানতের হার এবং সামগ্রিক তারল্য ব্যবস্থাপনা জড়িত।

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রেজারি বিলের সুদহার কমেছে, তবে বাজারে এটির পূর্ণ প্রভাব পড়তে সময় লাগে। ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি, কারণ সরকারি বিনিয়োগমুখী অতিরিক্ত ঝোঁক ব্যাংক থেকে তহবিল সরিয়ে নিতে পারে, যা আর্থিক মধ্যস্থতাকে দুর্বল করবে।

মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি এখনও একটি সংবেদনশীল বিষয় এবং কেবল মুদ্রানীতির মাধ্যমে সমাধান সম্ভব নয়। সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, দক্ষ বাজার নজরদারি এবং ব্যবসায়ী ও পাইকারদের সহযোগিতা অপরিহার্য। শুধু অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে অতিরিক্ত মুনাফালোভ বা মজুতদারি ঠেকানো যায় না।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতি দীর্ঘ সময়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। বৈষম্য, দারিদ্র্য ও কৃষিপণ্যের মূল্য বিকৃতি এখনও চ্যালেঞ্জ হলেও দেশটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি অর্জন করেছে।

অতিরিক্ত নেতিবাচক প্রচারণা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এতে আস্থা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।

তিনি বলেন, নীতিনির্ধারণ কখনোই জনপ্রিয়তাবাদ বা সংকীর্ণ স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হতে পারে না; সামগ্রিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় রাজস্ব ও মুদ্রানীতিকে ভারসাম্যপূর্ণ হতে হবে।

চলমান সংস্কার কার্যক্রম আরও স্থিতিশীল ও সহনশীল অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তুলছে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও প্রস্তুত করা প্রাথমিক আর্থিক তথ্য ও বিশ্লেষণমূলক প্রকাশনা স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক, বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাংকিং অ্যাসোসিয়েশন অর্থসংকটের মধ্যেও এসব কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অর্থ সচিব ড. খায়রুজ্জামান মজুমদার বলেন, গত দেড় বছরে দেশের আর্থিক খাত একটি সংকটকাল অতিক্রম করলেও এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে। বর্তমানে এলসি পরিশোধেও সমস্যা নেই।

তিনি বলেন, বেশ কয়েকটি সংকটাপন্ন ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এবং কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, ব্যাংকিং অ্যালম্যানাক সংশ্লিষ্ট অংশীজন, নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের জন্য একটি ‘পরিসংখ্যানভিত্তিক হ্যান্ডবুক’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং এটি অর্থনৈতিক ঝুঁকি বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা দিতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার বলেন, এ ধরনের গবেষণাভিত্তিক ও শ্রমসাধ্য প্রকাশনা নীতিনির্ধারকদের ব্যাংকিং খাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে।

বিএবি চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার বলেন, সুদের হার কমানো কোনোভাবেই সংগঠনের ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং অ্যালম্যানাক দেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা এবং এটি বাংলাদেশে সম্ভাব্য বিনিয়োগের দিক নির্দেশনা দিতেও সহায়ক।

সম্পাদক: মো. জেহাদ হোসেন চৌধুরী
যোগাযোগ: রিসোর্সফুল পল্টন সিটি (১১ তলা) ৫১-৫১/এ, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
মোবাইল: ০১৭১১-৯৫০৫৬২, ০১৯১২-১৬৩৮২২
ইমেইল: [email protected], [email protected]