ঢাকা শুক্রবার, ১৫ই জানুয়ারী ২০২১, ২রা মাঘ ১৪২৭


সোশ্যাল মিডিয়ায় রুচির আকাল


প্রকাশিত:
২৩ নভেম্বর ২০২০ ০৮:৩৮

আপডেট:
১৫ জানুয়ারী ২০২১ ২২:৫২

প্রতীকী ছবি

মানবসমাজে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়ের অনুভূতি চিরন্তন। এ অনুভূতি কতটুকু জন্মগত আর কতটুকু পরিবেশলব্ধ সে ব্যাপারে বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু সুজন-দুর্জন নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের চিন্তা-চেতনায় এ অনুভূতি প্রবলভাবে বিরাজ করে, সদা জাগরূক থাকে।

আপনারা দেখে থাকবেন, সমাজের প্রত্যেক মানুষের মধ্যে নিজেকে ভালো হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা কাজ করে। এমনকি দুর্বৃত্ত-দুর্জনেরাও চায় সোসাইটি তাকে ভালো হিসেবে চিত্রিত করুক। একজন লোক যত খারাপই হোক, সে কখনও চায় না অন্যরা তাকে খারাপ বলুক।

ভালো-মন্দের এ অনুভূতি মানুষের মধ্যে কি জন্মগতভাবেই আসে, নাকি পরিবার-পরিজন, সমাজ-সোসাইটি তার মধ্যে তৈরি করে। সে প্রশ্নটি বিশেষভাবে এ কারণেই আসতে পারে যে, অনেক বিষয়েই এক সমাজ থেকে অন্য সমাজে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থাকে।

এমন কিছু বিষয় আছে, যা নিয়ে হয়তো সমগ্র মানবগোষ্ঠীর মধ্যেই কোনো রকম ভিন্নমত খুঁজে পাওয়া যাবে না। ধরুন, সত্য কথা বলা কিংবা সদাচরণ করা-পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক, তা সভ্যতার সব উপকরণে সজ্জিত নগর-মহানগর, বিরান মরুভূমি কিংবা বন-জঙ্গল যাই হোক না কেন, এমন কোনো মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি এসব বিষয় যে ভালো ও অনুকরণীয় সে ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করছেন।

অন্যদিকে সাদা-কালো, আশরাফ-আতরাফ কিংবা শূদ্র-ব্রাহ্মণ ইত্যাকার বিভিন্ন নামে যে শ্রেণি বা বর্ণবৈষম্য, তা মনুষ্যসমাজে বহুকাল ধরে চলে আসছে।

সমাজের একটি অংশ অধিকতর সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছে আর ভাবছে, এটা তাদের ন্যায্য পাওনা। অন্য একটি অংশ বঞ্চনার শিকার হচ্ছে, এটাকে নীরবে সহ্য করে যাচ্ছে, এমনকি যুগের পর যুগ একই পরিস্থিতির শিকার হতে তাদের মধ্য থেকে বঞ্চনার অনুভূতিই হারিয়ে গেছে। ভাবছে এটাই তাদের নিয়তির লিখন।

এভাবে আরও অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে, যেখানে হয়তো দেখা যাবে অনেক বড় বড় বিষয়েই এক জনগোষ্ঠী থেকে অন্য জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গিতে বিস্তর ফারাক রয়েছে। নর-নারীর পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আধুনিককালে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গিতে যে বিস্তর ফারাক, তা এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে।

সমকামিতার মতো বিষয়, যা প্রাচ্যদেশে দুরাচার হিসেবে প্রায় সর্বজনস্বীকৃত, তা সভ্যতার জন্য গর্বের দাবিদার পাশ্চাত্যের অনেক দেশেই আইনি স্বীকৃতি পেয়েছে। গণিকাবৃত্তি ও গণিকালয়ের উপস্থিতি প্রাচ্যসমাজে থাকলেও একে সমাজ এখনও ভালো চোখে দেখে না, অথচ পাশ্চাত্য এটাকে রীতিমতো শিল্পের রূপ প্রদান করেছে।

খেয়াল করলে দেখবেন, এ রকম অনেক বিষয়ই আছে যেগুলোয় পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গি প্রাচ্য থেকে কোনো এক সময় ভিন্নতর ছিল না; কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সমাজের একটি বৃহত্তর গোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন আসে, ধর্মযাজক ও নীতিবাদীদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে, এক সময় সমাজে যা গুরুতর পাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল, তা সমাজে ব্যাপকভাবে সংঘটিত হতে থাকে এবং তার ফলই আজকের সামাজিক স্বীকৃতি। কাজেই এ ট্রান্সফর্মেশন একদিনে হয়নি। ধীর-লয়ে চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন ঘটতে ঘটতে বিষয়গুলো আজকের পর্যায়ে এসে ঠেকেছে।

তবে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সব জায়গায়ই কিছু মৌলিক বিষয়ে এখনও কোনো দৃষ্টিভঙ্গিগত তফাত তৈরি হয়নি। এমনই একটি বিষয় হয়তো সামাজিক সদাচার।

সবখানেই একটি শিশু যখন বড় হতে শুরু করে-বাবা-মা, পরিবার-পরিজন, সমাজ-সংসার-সবার কাছেই সে ধীরে ধীরে শিখতে থাকে-কীভাবে অন্যদের সম্ভাষণ করতে হবে, ছোট-বড়, ময়-মুরুব্বিদের সঙ্গে কথা বলতে হবে, আচরণ করতে হবে, আর কী ধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয় ইত্যাদি। একটি শিশু যখন বড় হয়ে বৃহত্তর সামাজিক পরিমণ্ডলে মিশতে শুরু করে, তখন এসব শিক্ষা প্রতিনিয়ত তার আচার-আচরণকে গাইড করতে থাকে।

বঙ্গীয় সমাজসহ সমগ্র উপমহাদেশে সামাজিক সদাচারের এ বিষয়টি এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী বলেই মনে হয়। পারিবারিক কিংবা বন্ধু-বান্ধবের ছোটখাটো পরিমণ্ডলে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় এমন কথাবার্তা, আচার-আচরণের কিছুটা চল থাকলেও ফরমাল সেটআপ কিংবা বৃহত্তর সামাজিক পরিমণ্ডলে রূঢ় আচরণ কিংবা অশোভন বাক্যালাপ কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হয়।

অনেকেই লক্ষ করে থাকবেন, বাসের মতো গণপরিবহনের বসার জায়গাগুলোর ওপরে কিছু নীতিবাক্য সুন্দর হরফে লেখা থাকে, যার একটি হল-‘ব্যবহারে বংশের পরিচয়’। উঠতি বয়সী কোনো ছেলেমেয়ে সামাজিক পরিমণ্ডলে অশোভন আচরণ করলে মুরুব্বিরা ক্ষেপে গিয়ে বলে ওঠেন: ‘বাবা-মা কি কিছুই শেখায়নি?’ উচ্চ সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদার কোনো ব্যক্তি যদি কোনো উল্টাপাল্টা আচরণ করেন কিংবা কথা বলে বসেন, সারা দেশে শোরগোল পড়ে যায়, দুয়োধ্বনি ওঠে।

অন্যায়-অবিচারের প্রতি মানুষের বিরূপ মনোভাব চিরন্তন। নিগৃহীত হলে মানুষমাত্রই বিক্ষুব্ধ হয়, প্রতিবাদ করে বা করতে চায়। সমাজ-সংসার নিগৃহীত মানুষের পাশে দাঁড়ায়। তার প্রতিবাদে সমর্থন জোগায়, তার সঙ্গে প্রতিবাদে শামিল হয়, প্রয়োজনে বৃহত্তর পরিসরে বিষয়টি তুলে আনে। মিছিল-মিটিংয়ের আয়োজন করে।

মিডিয়ায় প্রচার করে। সোশ্যাল মিডিয়ার আবির্ভাব ও অডিও-ভিজুয়াল প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার মানুষের এ প্রতিবাদী চেতনার বাস্তব রূপায়ণের বিষয়টি পানির মতো সহজ করে দিয়েছে। কারও ওপর নির্ভর না করে মানুষ বাটনের এক চাপেই যে কোনো ঘটন-অঘটন বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে পারছে। অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এমন সহজ সুযোগ বিশ্বের জন্য এক অভূতপূর্ব আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়ার এ সামগ্রিক কল্যাণধর্মী ভূমিকার বিপরীতে কিছু বিষয় সমাজ চিন্তকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় একজন ব্যক্তি তার টাইমলাইনে যা ইচ্ছা পোস্ট করতে পারে। কোনো গ্রুপে পোস্ট করলে যদিও গ্রুপ অ্যাডমিন/মডারেটরদের তা অ্যাপ্রুভ বা ডিজ-অ্যাপ্রুভ করার সুযোগ রয়েছে, কমেন্টিংয়ের ওপর বলতে গেলে তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না, বড়জোর কোনো কমেন্ট হাইড/ডিলিট করতে কিংবা কমেন্টিং টার্ন অফ করে দিতে পারে।

একজন ব্যক্তি যখন তার টাইমলাইনে তিলকে তাল বানিয়ে কিংবা স্রেফ গুজব রটিয়ে পোস্ট দেন কিংবা ভিউয়াররা অশোভন, কুরুচিপূর্ণ ভাষায় কমেন্ট করেন, একে অপরকে আক্রমণ করেন, তখন অন্যদের কিইবা করার থাকে? কখনও কখনও এমন সব ভাষার প্রয়োগ হয়, যা রীতিমতো খিস্তি খেউড়ের পর্যায়ে পড়ে এবং আপনি রুচির এ দুর্ভিক্ষে মনে মনে জপতে শুরু করতে পারেন, ‘ধরণি দ্বিধা হও’।

আফসোসের বিষয় হচ্ছে, এ ধরনের ভাষা যারা প্রয়োগ করছেন, তাদের অনেকেই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিদ্যাপীঠগুলোয় পড়ছেন কিংবা আগে পড়েছেন এবং এখন দেশ ও সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে বড় বড় আসন অলংকৃত করছেন।

এভাবে চলতে থাকলে এ সমাজে শত শত বছর যে সভ্য আচার-আচরণের চর্চা চলে আসছে, তার জায়গা দখল করে নেবে অসভ্যতা, অশ্লীলতা ও জংলিপনা। মনে রাখা চাই, ‘ব্যাধিই সংক্রামক, স্বাস্থ্য নয়’। এখনই সময় রাশ টেনে ধরার। ভাবতে হবে কীভাবে এসব বন্ধ করা যায়।

দরকার জোরালো ক্যাম্পেইনের। ওরা নিজ থেকে নিবৃত হন তো ভালো, নইলে প্রয়োজনে তাদের সামাজিকভাবে বয়কট ও শায়েস্তা করার জন্য আওয়াজ তুলতে হবে।

ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন
অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top