সোমবার, ২৫শে মে ২০২৬, ১০ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
২০২৬ সালের জুনে নতুন সরকার তাদের প্রথম জাতীয় বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে। অর্থনীতির ভাষায় বাজেট হলো রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও জনপ্রশাসনের দৃষ্টিতে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ একটি বাজেটে ঠিক হয়-রাষ্ট্র কোন খাতে গুরুত্ব দিচ্ছে, কার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, কী ধরনের সমাজ গঠন করতে চায় এবং জনগণের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক কতটা দায়িত্বশীল হবে।
কাজেই এমন চিন্তা থেকে এটি স্পষ্ট যে বাজেট শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়। অন্যদিক থেকে এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়বদ্ধতা, রাজনৈতিক দর্শন এবং সুশাসনের প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশ বর্তমানে একদিকে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণের চাপ, বিনিয়োগ সংকট ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা; অন্যদিকে প্রশাসনিক দুর্বলতা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক মেরুকরণ, মব সন্ত্রাস, সামাজিক অসহিষ্ণুতা এবং জনগণের দায়িত্বহীনতার প্রসঙ্গ অনেক বেশি।
এ কথা বলার অবকাশ নেই যে, বর্তমান বাস্তবতায় রাষ্ট্রের ওপর নাগরিক আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এ বাস্তবতায় নতুন সরকারের প্রথম বাজেট শুধু অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ বা প্রচেষ্টা নয়; বরং এটি হতে পারে রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি তাৎপর্যপূর্ণ সুযোগ।
সুশাসনের ধারণাটি নতুন নয়। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার কথা বলেছিলেন। আধুনিক যুগে বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সুশাসনের কয়েকটি মৌলিক উপাদানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে-স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, অংশগ্রহণমূলক শাসন, কার্যকারিতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ। প্রশ্ন হচ্ছে, একটি জাতীয় বাজেট কীভাবে এসব নীতিকে বাস্তব রূপ দিতে পারে?
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় সমস্যা হলো যথাযথ জায়গায় ব্যয় না করা। প্রকল্পের ব্যয় বাড়ে, সময় বাড়ে, কিন্তু ফলাফল আসে না। অনেক উন্নয়ন প্রকল্পে কয়েকবার সংশোধিত ব্যয় অনুমোদন নিতে হয়। এতে জনগণের করের অর্থ অপচয় হয় এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। তাই এবারের বাজেটে ‘পারফরম্যান্স বেইজড বাজেটিং’ বা ফলাফলভিত্তিক বাজেট ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
উন্নত দেশগুলোয় সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট কর্মসম্পাদন সূচক নির্ধারণ করা হয়। যেমন কত দ্রুত নাগরিক সেবা দেওয়া হলো, দুর্নীতির অভিযোগ কত কমলো, ডিজিটাল সেবা কতটা বৃদ্ধি পেল, স্বাস্থ্য বা শিক্ষা খাতে জনগণের সন্তুষ্টি কতটা বাড়লো-এসব সূচকের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যৎ বাজেট বরাদ্দ নির্ধারিত হয়।
বাংলাদেশেও প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার জন্য ‘পারফরম্যান্স স্কোরকার্ড’ চালু করা যেতে পারে। যেসব প্রতিষ্ঠান দক্ষতা ও স্বচ্ছতা দেখাবে, তারা বাড়তি প্রণোদনা পাবে; ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
দুর্নীতি বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম বড় বাধা। দুর্নীতি শুধু অর্থের অপচয় করে না; এটি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে এবং মেধাবী জনগোষ্ঠীকে হতাশ করে। তাই দুর্নীতিবিরোধী লড়াইকে বাজেটের অন্যতম অগ্রাধিকার করা দরকার।
সিঙ্গাপুর, এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনের মাধ্যমে দুর্নীতি অনেকাংশে কমাতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশেও সরকারি সেবাকে পুরোপুরি ডিজিটালাইজ করার জন্য বড় পরিসরে বিনিয়োগ প্রয়োজন। ই-গভর্নেন্স, ই-ফাইলিং, ই-টেন্ডারিং, ডিজিটাল অডিট এবং ‘ওপেন বাজেট পোর্টাল’ চালু করা গেলে জনগণ অনলাইনে দেখতে পারবে কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে।
এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, তথ্য কমিশন এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো আরও কার্যকর করতে বাজেটে স্বাধীন ও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন। অনেক উন্নত দেশে এসব প্রতিষ্ঠানকে সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়, যাতে তারা রাজনৈতিক চাপ ছাড়াই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ‘মব জাস্টিস’ বা জনতার বিচারের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা এ সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলছে। একটি সভ্য রাষ্ট্রে আইনের শাসনের বিকল্প কখনও জনতার আবেগ হতে পারে না।
তাই এবারের বাজেটে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; বরং ‘সামাজিক প্রতিরোধমূলক শাসনব্যবস্থা’ গড়ে তোলার দিকে নজর দিতে হবে। কমিউনিটি পুলিশিং, স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, তরুণদের কাউন্সিলিং, অনলাইন গুজব প্রতিরোধ ইউনিট এবং সামাজিক সচেতনতা কর্মসূচির জন্য বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন।
ফিনল্যান্ড ও নরওয়ের মতো দেশগুলো স্কুল পর্যায়ে ‘মিডিয়া লিটারেসি’ শিক্ষা চালু করেছে, যাতে মানুষ ভুয়া তথ্য ও উসকানিমূলক প্রচারণা চিহ্নিত করতে শেখে। বাংলাদেশেও ডিজিটাল নাগরিক শিক্ষা ও সামাজিক সহনশীলতা বৃদ্ধির জন্য বাজেটে আলাদা কর্মসূচি থাকা উচিত।
সুশাসন কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; নাগরিকদের আচরণও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রায়ই রাষ্ট্রের সমালোচনা করি, কিন্তু নিজের দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখাই। কর ফাঁকি দিয়ে উন্নয়ন আশা করা, ট্রাফিক আইন না মেনে শৃঙ্খলার দাবি করা কিংবা রাজনৈতিক অন্ধ সমর্থন দিয়ে গণতন্ত্র চাওয়া-এসব আচরণ রাষ্ট্রকে দুর্বল করে।
তাই শিক্ষা খাতে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়; ‘নৈতিক ও নাগরিক শিক্ষা’কে গুরুত্ব দিতে হবে। স্কুল-কলেজে গণতন্ত্র, সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ, কর সংস্কৃতি এবং সামাজিক আচরণ নিয়ে বাস্তবভিত্তিক পাঠ চালু করা যেতে পারে।
জাপানে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের সামাজিক দায়িত্ববোধ শেখানো হয়। তারা নিজের শ্রেণিকক্ষ নিজেরাই পরিষ্কার করে। ফলে নাগরিক দায়িত্ব তাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশেও এ ধরনের সামাজিক শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রশাসন অত্যন্ত ক্ষমতাকেন্দ্রিক। ফলে স্থানীয় সমস্যা সমাধানে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। অথচ উন্নত দেশগুলোয় স্থানীয় সরকারকে আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা দেওয়া হয়। সুইডেন, ডেনমার্ক কিংবা কানাডায় স্থানীয় সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবার বড় অংশ পরিচালনা করে।
বাংলাদেশেও ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনকে আরও আর্থিক ক্ষমতা দিতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে কর সংগ্রহ, বাজেট পরিকল্পনা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়াতে পারলে সেবা আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে। ‘পার্টিসিপেটরি বাজেটিং’ চালু করা যেতে পারে, যেখানে স্থানীয় জনগণ নিজেরাই নির্ধারণ করবে কোন খাতে বাজেট ব্যয় হবে।
যে দেশে তরুণদের বড় অংশ বেকার বা হতাশ, সেখানে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ার ঝুঁকি থাকে। বেকারত্ব কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি রাজনৈতিক সহিংসতা, মাদকাসক্তি এবং অপরাধ বৃদ্ধির সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষতা উন্নয়নকে সুশাসনের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
বাংলাদেশের বাজেটে প্রযুক্তি শিক্ষা, স্টার্টআপ ফান্ড, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং গবেষণা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুর তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করেই উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করেছে। বাংলাদেশের তরুণদেরও চাকরি খোঁজার মানসিকতা থেকে বের করে উদ্যোক্তা হওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
বর্তমান বিশ্বে সুশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পরিবেশগত জবাবদিহিতা। বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও পরিবেশ দূষণ, নদী দখল এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তাই ‘গ্রিন বাজেটিং’ ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
উন্নত দেশগুলো পরিবেশবান্ধব শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গণপরিবহন এবং টেকসই নগর ব্যবস্থাপনায় বড় বিনিয়োগ করে। বাংলাদেশেও সৌরশক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নদী পুনরুদ্ধার এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষিতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের বাজেট অনেক সময় রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা অর্জনের হাতিয়ার হয়ে পড়ে। কিন্তু উন্নত রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার ভিত্তিতে বাজেট প্রণয়ন করে। তারা জানে, সুশাসন ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও টেকসই হয় না।
এই বাস্তবতায় নতুন সরকারের প্রথম বাজেট একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে-রাষ্ট্র কি কেবল বড় বড় প্রকল্প নির্মাণে ব্যস্ত থাকবে, নাকি মানুষের আস্থা, ন্যায়বিচার ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান গঠনে বিনিয়োগ করবে?
কারণ উন্নত রাষ্ট্র শুধু অবকাঠামো দিয়ে গড়ে ওঠে না; গড়ে ওঠে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, দায়িত্বশীল নাগরিক এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনের ওপর। আর একটি দূরদর্শী বাজেট সেই রাষ্ট্রগঠনের প্রথম রাজনৈতিক অঙ্গীকার হয়ে উঠতে পারে।
ড. সুলতান মাহমুদ রানা : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়