সোমবার, ২৫শে মে ২০২৬, ১০ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ফাইল ছবি
প্রতি ঈদে লাখো মানুষ পাহাড়-সমুদ্রের পথে বেরিয়ে পড়ে, পর্যটন এখন বাংলাদেশের একটি বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তি। কিন্তু এই বিশাল উৎসব-ঢলকে সামলানোর পরিকল্পনা কতটুকু আছে?
রাশেদকে রাত তিনটায় ঘুম থেকে তুলে দিলো তার সাত বছরের মেয়ে নীলা। অন্ধকার ঘরে জুতো পরে, ছোট্ট ব্যাগটা গুছিয়ে সে তৈরি হয়ে বসে আছে, যেন আর এক মুহূর্তও দেরি করা যাবে না। বাবা চোখ খুলতেই সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে, বাবা, কক্সবাজার কি শুরু হয়ে গেছে?
মিরপুরের একটি গার্মেন্টসে কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর হিসেবে কাজ করে রাশেদ। মেয়ের কথা শুনে সে এত জোরে হেসে ফেলল যে তার স্ত্রীও ঘুম থেকে উঠে গেল। এই ভ্রমণের জন্য সে তিন মাস ধরে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়েছে। ঈদের ছুটি মাথায় রেখে ছয় সপ্তাহ আগেই কক্সবাজারে বুক করেছে ছোট্ট একটা হোটেল রুম দুইটা বেড, একটা সিলিং ফ্যান, খুব সাধারণ ব্যবস্থা। কিন্তু নীলার কাছে সেটাই যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিলাসিতা। কারণ এবারই সে প্রথম সমুদ্র দেখতে যাচ্ছে।
রাশেদ শুধু একা নয়। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ঈদের ছুটিতে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ দেশের বিভিন্ন পর্যটন গন্তব্যে ভ্রমণ করে। গত ঈদুল আজহায় শুধু কক্সবাজারেই এক সপ্তাহে চার লাখ পর্যটক এসেছে। কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের হিসাবে সেই সময় লেনদেন হয়েছে ৪০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা।
এবারের ঈদুল ফিতরে মাত্র তিন দিনে সাড়ে তিন লাখ মানুষ কক্সবাজারে গেছে। সুন্দরবনের করমজলে চার দিনে এসেছে ১২ হাজার দর্শনার্থী। খাগড়াছড়ির আলুটিলায় এক বিকেলে ছিল তিন হাজারের বেশি মানুষ। এই উৎসব-পর্যটনের মোট আর্থিক প্রভাব একেকটি ঈদে দশ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন।
পর্যটন এখন বাংলাদেশের জিডিপিতে তিন শতাংশ অবদান রাখছে, সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে ৪৩ লাখ মানুষের। এই শিল্পের বাজার বার্ষিক প্রায় দশ শতাংশ হারে বাড়ছে, ২০২৯ সালের মধ্যে এর আকার দাঁড়াবে ২২ হাজার কোটি টাকারও বেশিতে।
পর্যটন এখন বাংলাদেশের জিডিপিতে তিন শতাংশ অবদান রাখছে, সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে ৪৩ লাখ মানুষের। এই শিল্পের বাজার বার্ষিক প্রায় দশ শতাংশ হারে বাড়ছে, ২০২৯ সালের মধ্যে এর আকার দাঁড়াবে ২২ হাজার কোটি টাকারও বেশিতে।
এই উত্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি দেশের দ্রুত বিস্তৃত মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা বাংলাদেশের পর্যটনের চিত্র বদলে দিচ্ছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রায় ৪ কোটি মানুষ মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে ৬ কোটিতে পৌঁছাতে পারে, অর্থাৎ প্রতি তিনজন বাংলাদেশির একজন হবেন মধ্যবিত্ত। একই সঙ্গে বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ-এর তথ্য বলছে, প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ মানুষ মধ্য ও সচ্ছল শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে, যার প্রবৃদ্ধির হার ১০.৫ শতাংশ ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার বা থাইল্যান্ডের চেয়েও দ্রুত। এই নতুন মধ্যবিত্তের সঙ্গে বদলেছে ভ্রমণের ধারণাও।
পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলকে নতুনভাবে যুক্ত করেছে, অনলাইন বুকিং ভ্রমণকে সহজ করেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভ্রমণ-স্বপ্নকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। বাংলাদেশে ঈদের ভ্রমণ একসময় ছিল শুধু ‘বাড়ি ফেরা’।
এখন তার সঙ্গে সমান গুরুত্ব নিয়ে যোগ হয়েছে ‘ঘুরতে যাওয়া’, পরিবার নিয়ে পাহাড়, সমুদ্র, ঝর্ণা কিংবা হাওরের পথে বেরিয়ে পড়া। কিন্তু এখানেই একটি জরুরি প্রশ্ন আসে, আমরা কি এই দ্রুত বেড়ে ওঠা পর্যটন বাস্তবতাকে পরিকল্পিতভাবে সামলাতে প্রস্তুত?
কারণ সম্ভাবনার পাশাপাশি বিশৃঙ্খলাও দ্রুত বাড়ছে। অনেক দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, বড় উৎসব মৌসুমে যদি পরিবহন, মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে পর্যটন দ্রুতই বৈষম্য ও অদক্ষতার বাজারে পরিণত হয়। বাংলাদেশেও তার লক্ষণ স্পষ্ট।
রাশেদ হোটেলে পৌঁছে দেখল তার বুক করা রুমটির ভাড়া সাধারণ সময়ের তিনগুণ। এটা তার জানাই ছিল, সে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু পাশের রুমের পরিবারটি আগে বুক করেনি, এসে দেখল সব রুম ‘বুকড’, তবে দ্বিগুণ দামে পাওয়া যাচ্ছে, নগদে, রসিদ ছাড়া।
রেস্তোরাঁয় মেনু কার্ড উধাও, দাম বলা হচ্ছে মুখে মুখে। কক্সবাজার বিচে ঘোড়ার গাড়ি থেকে ফটোগ্রাফার সবকিছুর দামই তিনগুণ। ঈদ শেষ হলেই আবার স্বাভাবিক। এই স্বল্পমেয়াদি মুনাফার সংস্কৃতি পর্যটককে বিরক্ত করে, বারবার ফিরে আসার ইচ্ছা কমায়। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো তাই শুধু পর্যটক বাড়ানোর দিকে না গিয়ে অভিজ্ঞতা, নিরাপত্তা এবং আস্থা তৈরির দিকে জোর দিয়েছে কারণ টেকসই পর্যটন মানে বারবার ফিরে আসার ইচ্ছা তৈরি করা।
কেন্দ্রীভূত সমস্যাটা আরও প্রকট। ২০২৫ সালের বিজয় দিবসের ছুটিতে সাজেকে ১২০টা রিসোর্ট-কটেজের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ছিল দুই হাজার, অথচ এসেছিল চার হাজারের বেশি পর্যটক, বাকিরা রাত কাটিয়েছে ক্লাবহাউসে, বারান্দায়, গুদামঘরে। একশোরও বেশি পর্যটক রুম না পেয়ে পরদিন ফিরে গেছে।
অথচ একই সময়ে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়, নেত্রকোণার বিরিশিরিতে, নাটোরের উত্তরা গণভবনে কোনো পর্যটক নেই বললেই চলে। এই বৈপরীত্যই বাংলাদেশের পর্যটনের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত সমস্যাগুলোর একটি, পর্যটন এখনো কয়েকটি পরিচিত গন্তব্যে সীমাবদ্ধ যেমন কক্সবাজার, সাজেক, সুন্দরবন।
ফলে একদিকে অতিরিক্ত চাপ, অন্যদিকে বিশাল সম্ভাবনা অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। কেন্দ্রীভূত হওয়ার ফলে শুধু ভিড় নয়, পরিবেশগত ঝুঁকি, নিরাপত্তাহীনতা এবং স্থানীয় অর্থনীতির অসম বণ্টনও তৈরি হচ্ছে। অথচ ময়নামতি, পুঠিয়া, রাতারগুল, হাওর, নদী-চর কিংবা গ্রামীণ সংস্কৃতির মতো অসংখ্য সম্ভাবনা এখনও মূলধারার বাইরে।
এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয় আরও একটি গভীর প্রশ্ন, এই পর্যটন ব্যবস্থায় আসলে কারা অন্তর্ভুক্ত?
রাশেদের পাশের বাড়িতে থাকে করিম। রিকশা চালায়। তার মেয়েও শীলার বয়সী, সেও বলছে, বাবা, সমুদ্র দেখতে যাব। করিমের পক্ষে যাওয়া সম্ভব না। শুধু বাসভাড়াতেই তার পাঁচ দিনের আয় চলে যাবে। ঈদের মৌসুমে হোটেল ভাড়া তার কল্পনারও বাইরে। বাংলাদেশের পর্যটন পরিকল্পনায় তাই হয়তো করিম নেই। প্রান্তিক পরিবার নেই। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বয়স্ক একা মানুষ, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ, এদের কথা কেউ ভাবেনি। পর্যটন মানে ধরে নেওয়া হয় সুবিধাভোগী পরিবার যারা হোটেলে থাকবে, রেস্তোরাঁয় খাবে।
অথচ ইন্দোনেশিয়ায় সরকারি ভর্তুকিতে মাত্র দুই ডলারে ফেরিতে চড়ে শ্রমজীবী পরিবার দ্বীপ দেখতে যায়। বালিতে মৎস্যজীবীর বাড়িতে পর্যটক থাকে অল্প খরচে, আর আয়টা যায় সেই পরিবারের হাতে। ভারতের ‘দেখো আপনা দেশ’ কর্মসূচিতে ট্রেনের বিশেষ ছাড়ে নিম্নবিত্ত পরিবার পর্যটন করেছে।
পর্যটন যদি শুধু উচ্চবিত্ত বা শহুরে মধ্যবিত্তের জন্য হয়, তাহলে সেটা অসম একটি কাঠামো তৈরি করবে। অথচ মানুষের মানসিক সুস্থতা, অবসর, আনন্দ এসবও সামাজিক অধিকারের অংশ হওয়া উচিত। তাই এখন দরকার কিছু বাস্তবসম্মত, কিন্তু বড় পরিসরের পরিবর্তন।
পর্যটন শুধু বিনোদন নয়, এটা অর্থনীতি, সামাজিক সুযোগ এবং একটি দেশেকে জানার সুযোগ। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্মসংস্থান, আঞ্চলিক উন্নয়ন, মানুষের গতিশীলতা এবং জাতীয় সংযোগ।
প্রথমত, হোটেল ও সেবা খাতে উৎসব-মূল্য নিয়ন্ত্রণ জরুরি। স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ এবং রসিদ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডকে তেঁতুলিয়া, বিরিশিরি, ময়নামতি, রাতারগুলসহ বিকল্প গন্তব্যের প্যাকেজ তৈরি করতে হবে। একটি লাইভ ড্যাশবোর্ড থাকুক যেখানে পর্যটক জানতে পারবে কোথায় হোটেল রুম খালি আছে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ রেলওয়ে ও বিআইডব্লিউটিসিকে ঈদ সপ্তাহে কম ভাড়ায় বিশেষ রুট চালু করতে হবে, যাতে করিমের মতো নিম্নবিত্ত পরিবাররাও ট্রেনে চেপে কক্সবাজার, কুয়াকাটা যেতে পারে।
চতুর্থত, সুন্দরবন ও পার্বত্য অঞ্চলে ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে স্থানীয় পরিবারের ঘর হোমস্টেতে রূপান্তর করতে হবে, যেন আয় সরাসরি সেই মানুষের হাতে যায়।
পঞ্চমত, কক্সবাজারে ঈদ মৌসুমে পর্যাপ্ত লাইফগার্ড মোতায়েন এবং বিপজ্জনক এলাকা চিহ্নিত করা এখন জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। প্রতি ঈদে সমুদ্রে মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটা পরিকল্পনার ব্যর্থতা।
সর্বোপরি, একটি জাতীয় ‘উৎসব পর্যটন পরিকল্পনা’ এখন সময়ের দাবি, যেখানে শুধু পর্যটক বাড়ানোর কথা নয়, বরং কোথায় যাবে, কীভাবে যাবে, কারা উপকৃত হবে, পরিবেশ কীভাবে রক্ষা হবে, এসবও সমান গুরুত্ব পাবে।
অবশেষে নীলাদের বাস থামল। আকাশজুড়ে গোলাপি আর কমলা রঙের ছোঁয়া, সামনে বঙ্গোপসাগর—অসীম নীলের বিস্তার। নীলা নেমেই কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়াল, তারপর ধীরে ধীরে পানির দিকে এগিয়ে গেল। ঢেউ এসে তার পা ছুঁয়ে গেল, আর সে হেসে উঠল। দৌড়ে বাবার কাছে ফিরে আবার ঘুরে দাঁড়াল সমুদ্রের দিকে, ভয় আর আনন্দ একসঙ্গে মিশে তার চোখে-মুখে। কিন্তু এই মুহূর্তটা কি সব সময় এতটা নিখুঁত থাকবে?
যদি হোটেলের ভাড়া হঠাৎ তিনগুণ হয়ে যায়, রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়, সৈকতে দাঁড়ানোর জায়গাই না থাকে, আর নিরাপত্তার অভাবে মানুষ সমুদ্রে নামতে ভয় পায়, তাহলে এই একই নীলা হয়তো একদিন আর ভোরে উঠে ব্যাগ গুছিয়ে বসে থাকবে না। হয়তো বলবে, ‘বাবা থাক, বাসায় থাকাই ভালো।’
পর্যটন শুধু বিনোদন নয়, এটা অর্থনীতি, সামাজিক সুযোগ এবং একটি দেশেকে জানার সুযোগ। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্মসংস্থান, আঞ্চলিক উন্নয়ন, মানুষের গতিশীলতা এবং জাতীয় সংযোগ। কিন্তু সেই পথটাই এখন অনেক সময় সংকীর্ণ, অপরিকল্পিত, আর করিমের মতো কোটি মানুষের জন্য অগম্য হয়ে যাচ্ছে।
এবারের ঈদুল আজহায় আবার প্রায় পঞ্চাশ লাখ মানুষ বের হবে ভ্রমণে। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক ভ্রমণপিয়াসু মানুষের জন্য একটি নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পরিকল্পিত পর্যটনবান্ধব পরিবেশ আদৌ প্রস্তুত আছে কি?
ড. প্রসেনজিৎ সাহা : সহকারী অধ্যাপক, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়