রবিবার, ২৪শে মে ২০২৬, ১০ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


প্রবাসে বিভক্তি

দেশে তার রাজনৈতিক প্রতিফলন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:২৪ মে ২০২৬, ১৮:১৩

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বাংলাদেশের রাজনীতি এখন আর দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঘিরে গড়ে উঠেছে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অসংখ্য শাখা, উপশাখা ও সমর্থক সংগঠন।

যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, কানাডা, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া কিংবা অস্ট্রেলিয়া—যেখানেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি কমিউনিটি রয়েছে, সেখানেই কোনো না কোনোভাবে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক উপস্থিতি দেখা যায়।

এই বাস্তবতা একদিকে যেমন প্রবাসীদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বহিঃপ্রকাশ, অন্যদিকে এটি দেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রাও যোগ করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিদেশভিত্তিক এসব রাজনৈতিক শাখা বাংলাদেশের মূল রাজনীতিতে কতটা বাস্তব প্রভাব বিস্তার করে? এগুলো কি শুধুই আবেগনির্ভর সাংগঠনিক উপস্থিতি, নাকি দেশের ক্ষমতার রাজনীতিতেও এদের কার্যকর ভূমিকা রয়েছে?

বাস্তবতা হলো, দুই দশকে প্রবাসভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে দৃশ্যমান প্রভাব তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্রচারণা এবং আন্তর্জাতিক লবিংয়ের যুগে প্রবাস রাজনীতি এখন অনেক বেশি সংগঠিত ও কৌশলগত হয়ে উঠেছে।

অতীতে বিদেশে দলীয় শাখাগুলোর কার্যক্রম মূলত সীমাবদ্ধ ছিল আলোচনা সভা, জাতীয় দিবস পালন কিংবা দলীয় নেতাদের সফরকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি অনেক বদলেছে। এখন প্রবাসী শাখাগুলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে মতামত প্রচার, মানবাধিকার ইস্যু উত্থাপন, বিদেশি রাজনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক জনমত তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে।

বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সংগঠনগুলো তুলনামূলক বেশি সক্রিয়। কারণ এই দেশগুলোয় রয়েছে বড় বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী প্রবাসী নাগরিকগোষ্ঠী। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, দেশের বড় রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিদেশে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ কিংবা লবিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

তবে প্রবাস রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত অর্থনৈতিক। নির্বাচনী সময়ে কিংবা রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বিদেশে অবস্থানরত সমর্থকদের আর্থিক সহযোগিতা দলগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনেক প্রবাসী ব্যবসায়ী ও সংগঠক দলীয় কার্যক্রমে অর্থায়ন করেন। যদিও এই অর্থায়নের স্বচ্ছতা ও আনুষ্ঠানিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তবুও অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রবাসভিত্তিক সমর্থন অনেক সময় দেশের রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলে।

এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে বিদেশে অবস্থানরত রাজনৈতিক কর্মীরা দেশের রাজনৈতিক প্রচারণায় সরাসরি অংশ নিচ্ছেন। ইউটিউব, ফেসবুক, এক্স কিংবা অনলাইন টকশোতে প্রবাসী নেতাকর্মীদের সক্রিয়তা এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। ফলে রাজনৈতিক বক্তব্য, সমালোচনা, প্রচারণা কিংবা গুজব—সবকিছুই খুব দ্রুত বৈশ্বিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে যেমন মতপ্রকাশের ক্ষেত্র বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি বিভ্রান্তি ও অপতথ্যের ঝুঁকিও বেড়েছে।

তবে প্রবাসভিত্তিক রাজনীতির ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি নেতিবাচক বাস্তবতাও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশের মাটিতে দেশের রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র রূপ নেয়। কমিউনিটির ভেতরে বিভক্তি তৈরি হয়, সামাজিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রবাসীদের অভিন্ন স্বার্থ উপেক্ষিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে একই দেশের অভিবাসী কমিউনিটিতে দলীয় বিভাজনের কারণে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও প্রভাবিত হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রবাসভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর অনেক নেতাই দীর্ঘদিন দেশের বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে দূরে থাকেন। ফলে তাদের বক্তব্য বা অবস্থান অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেন্দ্রিক আবেগনির্ভর রাজনীতি অনেক সময় দেশের ভেতরের জটিল বাস্তবতাকে সরলীকৃত করে তুলে ধরে, যা রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বাড়াতে পারে।

অন্যদিকে, ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করা গেলে প্রবাসী রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের জন্য বড় কূটনৈতিক সম্পদও হতে পারে। উন্নত দেশগুলোয় বসবাসরত বাংলাদেশি পেশাজীবী, ব্যবসায়ী ও নাগরিক নেতাদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জনকূটনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব। কিন্তু সেটি তখনই সম্ভব হবে, যখন প্রবাস রাজনীতি কেবল দলীয় সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে জাতীয় স্বার্থকেও গুরুত্ব দেবে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও এটি আত্মসমালোচনার বিষয়। বিদেশে দলীয় শাখা গঠন করলেই রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি হয় না; বরং প্রয়োজন দায়িত্বশীল সাংগঠনিক সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং ইতিবাচক জনসম্পৃক্ততা। শুধু ক্ষমতার রাজনীতির সম্প্রসারণ হিসেবে প্রবাস শাখাগুলো ব্যবহার করলে দীর্ঘমেয়াদে তা কমিউনিটির মধ্যেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বায়নের এই যুগে প্রবাস রাজনীতি পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কারণ বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ এখন বৈশ্বিক শ্রমবাজার, ব্যবসা ও শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত। ফলে দেশের রাজনীতিও স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক মাত্রা পাচ্ছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা কি দেশের গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও কূটনীতিকে শক্তিশালী করবে, নাকি কেবল রাজনৈতিক বিভাজনের বৈশ্বিক রূপে পরিণত হবে?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের প্রবাস রাজনীতির চরিত্র এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির নতুন দিকনির্দেশনা।

মো. কামরুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়