শুক্রবার, ৪ঠা এপ্রিল ২০২৫, ২০শে চৈত্র ১৪৩১


ভারতে হিজাব নিয়ে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ছড়াচ্ছে যেভাবে


প্রকাশিত:
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ০৪:০৪

আপডেট:
৪ এপ্রিল ২০২৫ ০১:৩৯

হিজাব পরার কারণে কলেজ ছাত্রী মুসকানের দিকে তেড়ে আসে উগ্রবাদীরা

হিজাব ইস্যুতে উত্তপ্ত গোটা ভারত। দেশটিতে সংখ্যালঘুদের প্রতি উগ্র সাম্প্রদায়িকতার ছোবল সারাবিশ্বে এখন আলোচিত নিন্দিত। বিবিসি জানায়, ঘটনার শুরু কর্নাটক রাজ্যের কুন্ডাপুর সরকারি পিইউ কলেজ থেকে। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছয়জন মুসলিম ছাত্রীর অভিযোগ, নির্দিষ্ট ইউনিফর্মের পাশাপাশি মাথায় হিজাব পরতে চাইলে কয়েক সপ্তাহ ধরে তাদেরকে ক্লাস করতে দেয়া হচ্ছে না। ছয় ছাত্রীর একজন বলেন, তাদের কয়েকজন পুরুষ শিক্ষক আছেন। তাদের সামনে মাথার চুল-ঢাকা পোশাাক পরা দরকার বলেই তারা হিজাব পরছেন। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষের ভাষ্য ভিন্ন। কলেজের পক্ষে জানানো হয়, তারা শুধু ক্লাসে হিজাব না পরার কথা বলেছেন; ক্লাসের বাইরে কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের হিজাব পরতে কোন বাধা নেই।

এ কলেজের হিজাব-পরা একদল ছাত্রীকে ঢুকতে না দিয়ে গেট বন্ধ করে দেয়ার ভিডিও ও ছবি ভাইরাল হলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে কর্নাটক রাজ্যের অন্যান্য হাইস্কুল ও কলেজে। আক্রমনাত্মক হয়ে ওঠে হিন্দু ছাত্ররা। হিন্দুত্বের প্রতীক কমলা বা গেরুয়া শাল বা স্কার্ফ পরে ক্লাসে আসতে শুরু করে। নিজের সহপাঠীদের হিজাব পরার বিরুদ্ধে মিছিল করে হিন্দু ছাত্র ও ছাত্রীরা। এ ধারাবাহিকতায় সহিংসতার খবর পাওয়া যায় কর্নাটক রাজ্যের অনেক শহর থেকে।

কলেজ ছাত্রী মুসকান খানের ভিডিও ভাইরাল-
এমন অবস্থায় কর্ণাটকের কলেজ ছাত্রী মুসকান খানকে উগ্র হিন্দু যুবকরা আক্রমনাত্বক প্রতিরোধ করলে আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে গোটা ভারতের পরিস্থিতি। ভিডিতে দেখা যায় নিজে স্কুটি চালিয়ে মান্ডিয়া জেলায় পিইএস কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকছেন বিবি মুসকান খান। স্কুটি পার্কিং এ রেখে কলেজ ভবনের দিকে যাওয়ার সময় কমলা বা গেরুয়া স্কার্ফধারী একদল তরুণ তার দিকে এসে 'জয় শ্রীরাম' শ্লোগান দিতে থাকে। তখন মুসকানও পাল্টা 'আল্লাহু আকবর' শ্লোগান দেন। কিছু সময় পর কলেজের কয়েকজন শিক্ষককে এসে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায়।

পরে বিবি মুসকান ভারতের এনডিটিভি চ্যানেলকে ইংরেজিতে একটি সাক্ষাতকার দেন। সেখানে জানান, তিনি এ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে কলেজে এসেছিলেন, কিন্তু বোরকা পরার কারণে তাকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেয়া হচ্ছিল না। "একদল তরুণ আমার সামনে এসে জয় শ্রীরাম শ্লোগান দিচ্ছিল - তখন আমিও পাল্টা আল্লাহু আকবর বলে চিৎকার করতে থাকি।" তরুণদের বেশিরভাগই বহিরাগত বলেও জানান তিনি। মুসকান বলেন, কলেজের অধ্যক্ষ ও শিক্ষকরা তাকে নিরাপদ রাখতে সহায়তা করেছেন। এনডিটিভিকে মুসকান আরও বলেন, সবসময়ই বোরকা ও হিজাব পরে কলেজে যান তিনি। তবে ক্লাসে বোরকা খুলে রেখে শুধু হিজাব পরেন। ওই সাক্ষাতকারে বিবি মুসকান বলেন,"আমি হিজাব পরা অব্যাহত রাখবো, কারণ এটি একজন মুসলিম মেয়ের পোশাকের অংশ "।

মঙ্গলবার এ নিয়ে টুইট করেন পাকিস্তানে মেয়েদের স্কুলে যাবার অধিকারের কথা বলার কারণে তালেবানের হাতে গুলিবিদ্ধ হবার পরও বেঁচে যাওয়া মালালা ইউসুফজাই। নোবেলজয়ী মালালা মন্তব্য করেন, "হিজাবের কারণে মেয়েদের স্কুলে যেতে না দেয়াটা ভয়াবহ ব্যাপার। মেয়েরা কম বা বেশি যতটুকুই কাপড় পরুক - তাদের পণ্য হিসেবে দেখাটা চলছেই। ভারতের নেতাদের অবশ্যই মুসলিম মেয়েদের মার্জিনালাইজ করা বন্ধ করতে হবে।"

এদিকে মানবাধিকারকর্মীদের মন্তব্য; হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি-শাসিত কর্ণাটক রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ক্রমাগত যে হয়রানি হচ্ছে - এটি তারই সবশেষ দৃষ্টান্ত। বিবিসি সংবাদদাতা জানান, ঘটনা যে জেলায় ঘটছে তা-ও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি কর্নাটক রাজ্যের সাম্প্রদায়িকভাবে স্পর্শকাতর উপকুলীয় এলাকার একটি জায়গা। অনেকে বলেন, এটিই হচ্ছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উগ্রপন্থী দল বিজেপি-র একটি শক্ত ঘাঁটি, এবং হিন্দু-জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একটি ল্যাবরেটরি। কর্নাটক রাজ্যেও এখন বিজেপি ক্ষমতায়।

এই এলাকায় দিন দিন ছড়িয়ে পড়ছে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প। হিজাব বিতর্কের পর কর্ণােটকের কিছু কলেজ-হাইস্কুলে হিন্দুত্বের প্রতীক কমলা বা গেরুয়া স্কার্ফ পরে আসতে শুরু করে ছাত্ররা। ওই কলেজ অধ্যক্ষ রুদ্র গৌড়ার বক্তব্যেও ছিল সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ। তার ভাষায় "শুধু ৬ জন মেয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সমস্যা সৃষ্টি করছে !" নিজের যুক্তির পক্ষে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীর মুখ দেখতে পাওয়া শিক্ষকের জন্য প্রয়োজনীয়। তবে ৬ ছাত্রীর একজন আলমাস বলেন, ফরমটিতে শুধু কলেজ ইউনিফর্ম পরার বাধ্যবাধকতার কথা আছে, হিজাবের ব্যাপারে তাতে কিছু বলা নেই।

তবে বরাবরের মত বিষয়টিকে রাজনৈতিক ইস্যু বলে চালিয়ে দিতে ভুল করেননি কর্ণাটক রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী নাগেশ বিসি। তিনি বলেন, এর পেছনে রাজনীতি আছে! তার মতে "আগামী বছর এ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন আছে, একারণেই এসব ঘটছে। "

ডিএম/জুআসা/২০২২



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


রিসোর্সফুল পল্টন সিটি (১১ তলা) ৫১-৫১/এ, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
মোবাইল: ০১৭১১-৯৫০৫৬২, ০১৯১২-১৬৩৮২২
ইমেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক: মো. জেহাদ হোসেন চৌধুরী

রংধনু মিডিয়া লিমিটেড এর একটি প্রতিষ্ঠান।

Developed with by
Top