রবিবার, ২৬শে এপ্রিল ২০২৬, ১৩ই বৈশাখ ১৪৩৩


Sleep ASMR : মস্তিষ্কের সেই রহস্যময় শিহরণ

ফাহিমা হোসেন মুনা

প্রকাশিত:২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৩:০৬

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

ASMR কী? — প্রথমেই জানি মূল বিষয়টা। ASMR মানে হলো Autonomous Sensory Meridian Response। বাংলায় বলতে গেলে — এটি একটি বিশেষ শারীরিক অনুভূতি, যেটা মাথার তালু থেকে শুরু হয়ে ঘাড়, কাঁধ এবং মেরুদণ্ড বেয়ে নিচে নামে। অনেকে এটাকে বলেন "brain tingles" — একটা মিষ্টি, শিরশিরে, আরামদায়ক অনুভূতি।

এই অনুভূতি তৈরি হয় কিছু বিশেষ ট্রিগার এর মাধ্যমে:

- কেউ ফিসফিস করে কথা বলছে
- কাগজ ওল্টানোর মৃদু শব্দ
- চুল আঁচড়ানোর আওয়াজ
- বৃষ্টির টুপটাপ
- কেউ মনোযোগ দিয়ে তোমার দিকে তাকিয়ে আছে

সবাই এই অনুভূতি পায় না — গবেষণা বলছে পৃথিবীর প্রায় 20–30% মানুষ ASMR অনুভব করতে পারেন। বাকিদের কাছে এটা শুধুই একটা সাধারণ শব্দ।

Sleep ASMR — রাতের ঘুমের সাথে সম্পর্ক কীভাবে?

ইনসোমনিয়া বা ঘুম না আসার মূল কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হলো অতিরিক্ত চিন্তা, উদ্বেগ, এবং একটি অতি-সক্রিয় মস্তিষ্ক।রাতে শুয়ে পড়লেই মাথায় আসে — কাল কী করব, আজকে কী ভুল হলো, ভবিষ্যতে কী হবে। এই "overthinking loop" মস্তিষ্ককে জাগিয়ে রাখে।Sleep ASMR ঠিক এখানেই কাজ করে।

এটি মস্তিষ্ককে একটি নিরাপদ, মনোযোগী জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে চিন্তার জায়গা নেই, শুধু আছে একটা মৃদু শব্দ, একটা উপস্থিতি, একটা শান্ত পরিবেশ। মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে "fight or flight" mode থেকে বেরিয়ে "rest and digest" mode এ চলে আসে।

নিউরোসায়েন্স কী বলছে?

- ডোপামিন ও অক্সিটোসিন নিঃসরণ ২০১৮ সালে University of Sheffield এর গবেষণায় দেখা গেছে — ASMR অনুভব করার সময় মস্তিষ্কে ডোপামিন এবং অক্সিটোসিন*নিঃসৃত হয়।
- ডোপামিন — আনন্দ ও পুরস্কারের অনুভূতি দেয়।
- অক্সিটোসিন — "bonding hormone" নামে পরিচিত, এটি নিরাপত্তা ও ভালোবাসার অনুভূতি তৈরি করে।এই দুটো হরমোন একসাথে কাজ করলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই শিথিল ও ঘুমন্ত অনুভব করে।
- কর্টিসল কমে যায়।

কর্টিসলহলো স্ট্রেস হরমোন। যখন আমরা চিন্তিত বা উদ্বিগ্ন থাকি, কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে যায়, যা ঘুমের সবচেয়ে বড় শত্রু।

ASMR শোনার সময় কর্টিসলের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। ফলে শরীর ও মন দুটোই ধীরে ধীরে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হয়।

- আলফা ও থিটা ব্রেইনওয়েভ — EEG গবেষণায় দেখা গেছে, ASMR কন্টেন্ট দেখার সময় মস্তিষ্কে আলফা (8–12 Hz) এবং থিটা (4–8 Hz)ওয়েভ বৃদ্ধি পায়।
- আলফা ওয়েভ — গভীর শিথিলতার অবস্থা, ধ্যানের কাছাকাছি।
- থিটা ওয়েভ — ঘুম এবং জাগ্রত অবস্থার মাঝামাঝি একটি সীমানা, যেখানে মানুষ সবচেয়ে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ে।এটি ঠিক সেই অবস্থা যেটা মেডিটেশন করলে আসে — ASMR সেটাই করে দেয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে।
- Default Mode Network (DMN) নিষ্ক্রিয় হয়।

মস্তিষ্কের Default Mode Network হলো সেই অংশ যেটা তখন সক্রিয় হয় যখন আমরা কিছু না করে শুধু "মাথায় ঘোরাই" — অর্থাৎ overthinking।ASMR কন্টেন্টে মনোযোগ দিলে এই DMN ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। ফলে অতিরিক্ত চিন্তার চক্র ভেঙে যায় এবং মস্তিষ্ক ঘুমের দিকে এগোয়।

ইনসোমনিয়ায় ASMR কতটা কার্যকর?

২০১৫ সালে Reddit-এ পরিচালিত একটি বড় সার্ভেতে দেখা গেছে:

- 98% ব্যবহারকারী বলেছেন, ASMR তাদের শিথিল করতে সাহায্য করে।
- 82% বলেছেন, এটি তাদের ঘুমাতে সাহায্য করে।
- 70% বলেছেন, এটি তাদের উদ্বেগ কমায়। অবশ্যই ASMR কোনো চিকিৎসা নয় — গুরুতর ইনসোমনিয়ায় ডাক্তারের পরামর্শ জরুরি। কিন্তু হালকা থেকে মাঝারি ঘুমের সমস্যায় এটি একটি প্রাকৃতিক, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত সমাধান।

সবাই কি ASMR অনুভব করতে পারে?

না এবং এটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। গবেষকরা মনে করেন যাদের মস্তিষ্কে নিউরাল কানেকশন একটু বেশি সক্রিয় এবং যারা স্বভাবতই empathetic বা সংবেদনশীল, তারা ASMR বেশি অনুভব করেন।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ASMR অনুভবকারীদের মধ্যে Openness to Experience personality trait বেশি থাকে — অর্থাৎ তারা শিল্প, সংগীত, প্রকৃতির প্রতি বেশি সংবেদনশীল।

আর যারা ASMR অনুভব করেন না তাদের জন্য বৃষ্টির শব্দ, লো-ফাই মিউজিক, বা প্রকৃতির শব্দ একই কাজ করতে পারে।

রাতে কীভাবে Sleep ASMR ব্যবহার করবেন?

যা করণীয়:

- ঘুমানোর ৩০ মিনিট আগে শুরু করুন।
- ইয়ারফোন ব্যবহার করুন — অভিজ্ঞতা অনেক গভীর হয়।
- স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা একদম কমিয়ে দিন বা শুধু অডিও শুনুন।
- ঘর অন্ধকার রাখুন।
- ফোন উপুড় করে রাখুন — নোটিফিকেশন বন্ধ।

যা করবেন না:

- উত্তেজনাপূর্ণ কন্টেন্টের পর সরাসরি ASMR দেখবেন না।
- ভলিউম বেশি রাখবেন না — মৃদু শব্দই কার্যকর।
- নতুন ভিডিও খুঁজতে খুঁজতে রাত পার করবেন না — একটা playlist আগে থেকে বানিয়ে রাখুন।

সর্বোপরি, ASMR কোনো জাদু নয়, কোনো অদ্ভুত ট্রেন্ডও নয়।এটি মস্তিষ্কের একটি বাস্তব, পরিমাপযোগ্য প্রতিক্রিয়া— যেখানে সঠিক শব্দ ও উপস্থিতি মস্তিষ্কের রসায়ন পরিবর্তন করে দেয়। হাজার বছর ধরে মানুষ আগুনের ফুটফুট শব্দ, বৃষ্টির ছন্দ, মায়ের ফিসফিসে গল্প শুনে ঘুমিয়ে পড়েছে।

ASMR সেই আদিম অনুভূতিরই আধুনিক রূপ।

লেখক : ফাহিমা হোসেন মুনা। গবেষণা দলের প্রধান, BESS; প্রতিষ্ঠাতা ও কন্টেন্ট রাইটার, Antioxidant Pathways।

সম্পর্কিত বিষয়:

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়