বুধবার, ১৪ই জানুয়ারী ২০২৬, ৩০শে পৌষ ১৪৩২


বিক্ষোভের দাবানলেও কেন টিকে আছে ইরানের সরকার?


প্রকাশিত:
১৩ জানুয়ারী ২০২৬ ২২:৪৭

আপডেট:
১৪ জানুয়ারী ২০২৬ ০১:০২

ছবি-সংগৃহীত

দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভ ও বছরের পর বছর ধরে বিদেশি চাপ থাকা সত্ত্বেও ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর এলিটদের মাঝে ভাঙনের এমন কোনও লক্ষণ এখনও দেখা যায়নি; যা বিশ্বের অন্যতম স্থিতিশীল সরকারের পতন ডেকে আনতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বারবার সামরিক পদক্ষেপের হুমকি ইরানের ধর্মীয় শাসকদের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে। বিক্ষোভ দমনে তেহরানের কঠোর অভিযানের ঘটনায় ওই হুমকি এসেছে। গত বছর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার পর শুরু হওয়া পরিস্থিতির ধারাবাহিকতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওই হুমকি দিয়েছেন।

রাস্তায় অস্থিরতা ও বিদেশি চাপ যদি শীর্ষ পর্যায়ে বিভক্তি কিংবা দলত্যাগ ঘটাতে না পারে, তাহলে দুর্বল হলেও এই শাসনব্যবস্থা টিকে থাকবে বলে মনে করেন মধ্যপ্রাচ্যের দুই কূটনীতিক, দুটি সরকারি সূত্র ও দুজন বিশ্লেষক।

ইরানি এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, বিক্ষোভে প্রায় ২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তিনি বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুর জন্য সন্ত্রাসীদের দায়ী করেছেন। এর আগে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন দেশটিতে চলমান বিক্ষোভে প্রায় ৬০০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে বলে জানিয়েছে।

ইরানের কয়েক স্তরের নিরাপত্তা কাঠামোর কারণে অভ্যন্তরীণ ভাঙন ব্যতীত বাইরের চাপ দিয়ে দেশটিতে পরিবর্তন আনা অত্যন্ত কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন ইরানি-আমেরিকান শিক্ষাবিদ ও আঞ্চলিক সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ভালি নাসর। তিনি বলেন, দেশটির কয়েক ধাপের নিরাপত্তা স্তরের মূলভিত্তি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও আধা-সামরিক বাহিনী বাসিজ। এই দুই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ।

তিনি বলেন, এ ধরনের কিছু সফল করতে হলে দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তায় মানুষের জমায়েত থাকতে হবে। আর রাষ্ট্রের ভাঙন ঘটাতে হবে। রাষ্ট্রের কিছু অংশ, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি অংশকে দলত্যাগ করতে হবে।

ইরানের বিক্ষোভের বিষয়ে মন্তব্য জানতে জেনেভায় জাতিসংঘে ইরানি মিশন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রদপ্তর এবং হোয়াইট হাউসের সঙ্গে ই-মেইলে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

দেশটির ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি অতীতের একের পর এক অস্থিতিশীলতায়ও টিকে গেছেন। ২০০৯ সালের পর দেশটিতে পঞ্চম বৃহৎ আন্দোলন চলছে এবার। গভীর ও অমীমাংসিত অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখেও শাসনব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও সংহতির প্রমাণ এটি, বলেন মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের পল সালেম।

সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালান আইয়ার বলেন, পরিস্থিতি বদলাতে হলে, বিক্ষোভকারীদের এমন গতি তৈরি করতে হবে; যা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শক্তিশালী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় শাসনের প্রতি অনুগত বড় জনভিত্তি এবং ৯ কোটি জনসংখ্যার দেশটির ভৌগোলিক ও জনতাত্ত্বিক ব্যাপ্তি অতিক্রম করতে পারে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, টিকে থাকা মানেই স্থিতিশীলতা নয়। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ১৯৭৯ সালের পর থেকে সবচেয়ে গুরুতর চ্যালেঞ্জগুলোর একটির মুখোমুখি হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অর্থনীতিকে শ্বাসরুদ্ধ করে রেখেছে, পুনরুদ্ধারের স্পষ্ট কোনও পথ নেই। কৌশলগতভাবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপ রয়েছে, পারমাণবিক কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর আঞ্চলিক ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ নামে পরিচিত প্রক্সি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় মিত্রদের ভয়াবহ ক্ষতির ফলে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

নাসর বলেন, ইরান ‘পতনের মুহূর্তে’ পৌঁছেছে বলে মনে করেন না তিনি। তবে সামনে এগোনোর পথে দেশটি এখন ‌‌অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছে।

মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা সরাসরি দেশটির ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর বিরোধিতায় রূপ নেয়। রাজনৈতিকভাবে সহিংস দমন-পীড়ন ইরানের অবশিষ্ট বৈধতাকে আরও ক্ষয় করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ বলেছে, ইরানের চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ৫৭৩ জনের মৃত্যুর সত্যতা যাচাই করেছে তারা। এর মধ্যে ৫০৩ জন বিক্ষোভকারী ও ৬৯ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। সংগঠনটি বলেছে, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ১০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

• ট্রাম্পের বিকল্প বিবেচনা
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান বিক্ষোভের বর্তমান পরিস্থিতিকে আলাদা করে তুলেছে এবং ঝুঁকি বাড়িয়েছে ট্রাম্পের স্পষ্ট সতর্কবার্তা। তিনি বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারে।

রোববার মার্কিন এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছিলেন, ইরানের বিষয়ে বিকল্প সব উপায় নিয়ে আলোচনা করার জন্য মঙ্গলবার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন ট্রাম্প। তেহরান বলেছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগের পথ এখনও খোলা রয়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। সোমবার ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন তিনি। বিশ্বে তেহরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন।

শনিবার এক ফোনালাপে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানে মার্কিন হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

ইরান বিক্ষোভে ট্রাম্পের আগ্রহ আদর্শগত নয়, বরং কৌশলগত হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন সালেম। তিনি বলেন, রাষ্ট্রকে যথেষ্ট দুর্বল করে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে লাগামসহ বিভিন্ন ছাড় আদায় করাই এর উদ্দেশ্য হতে পারে।

ইরানে ট্রাম্পের লক্ষ্য সম্পর্কে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি হোয়াইট হাউস।

ওয়াশিংটন ও জেরুজালেমের কিছু মহলে ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’ ধারণাটি ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে বলে একজন কূটনীতিক ও তিন বিশ্লেষক রয়টার্সকে জানিয়েছেন। এই ধারণায় ইরানের শীর্ষ কর্তৃত্ব অপসারণ এবং অবশিষ্ট রাষ্ট্রযন্ত্রকে সংকেত দেওয়া হয়—সহযোগিতা করলে তারা নিজেদের জায়গায় থাকতে পারবেন।

তবে ইরানের ক্ষেত্রে এটি বড় বাধার মুখে পড়বে। কারণ দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংহতি এবং অনেক বড় ও জাতিগতভাবে জটিল এক দেশ ইরানে ভেনেজুয়েলা মডেল সফল হবে কি না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

আঞ্চলিক দুই কর্মকর্তা ও দুই বিশ্লেষক রয়টার্সকে বলেছেন, বিদেশি সামরিক পদক্ষেপ ইরানকে জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের দিকে ঠেলে দিতে পারে; বিশেষ করে কুর্দি ও সুন্নি বালুচ অঞ্চলে, যেগুলোর প্রতিরোধের ইতিহাস রয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এমন পদক্ষেপে এই মুহূর্তে সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী অন্যান্য স্থানে ব্যস্ত রয়েছে। যদিও কূটনীতিকরা বলছেন, সৈন্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত তড়িৎ গতিতে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।

মার্কিন থিঙ্কট্যাংক প্রতিষ্ঠান দ্য ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ডেভিড মাকোভস্কি বলেন, ট্রাম্প যদি পদক্ষেপ নেন, তাহলে তিনি দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের চেয়ে দ্রুত ও উচ্চপ্রভাব ফেলতে পারে এমন যেকোনও উদ্যোগ নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

‌‌‘‘তিনি এমন এক পদক্ষেপ খুঁজছেন, যা খেলা বদলে দিতে পারে—কিন্তু সেটি কী?’’ বলেন মাকোভস্কি। বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানি তেল পরিবহনে সামুদ্রিক চাপ সৃষ্টি থেকে শুরু করে লক্ষ্যভিত্তিক সামরিক বা সাইবার হামলা। এসবের প্রতিটিই গুরুতর ঝুঁকি বহন করে।

সব সূত্রই বলছে, কিছু পদক্ষেপ বলপ্রয়োগ ছাড়াও হতে পারে। যেমন বিক্ষোভকারীদের যোগাযোগে সহায়তার জন্য স্টারলিংকের মাধ্যমে ইন্টারনেট প্রবেশাধিকার পুনঃস্থাপন করা। ট্রাম্প কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেন বা আদৌ নেবেন কি না—এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নে হোয়াইট হাউস ও পররাষ্ট্র দপ্তর কোনও জবাব দেয়নি।

দ্য ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের মাকোভস্কি বলেন, ট্রাম্প কখনও কখনও সিদ্ধান্ত বিলম্বিত, প্রতিপক্ষকে নিরস্ত্র করা, আবার কখনো তিনি সত্যিই হস্তক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছেন—এমন সংকেত দিতেও হুমকিকে ব্যবহার করেন। ইরানের ক্ষেত্রে কোনটি প্রযোজ্য, আমরা তা এখনও জানি না।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


রিসোর্সফুল পল্টন সিটি (১১ তলা) ৫১-৫১/এ, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
মোবাইল: ০১৭১১-৯৫০৫৬২, ০১৯১২-১৬৩৮২২
ইমেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক: মো. জেহাদ হোসেন চৌধুরী

রংধনু মিডিয়া লিমিটেড এর একটি প্রতিষ্ঠান।

Developed with by
Top