সোমবার, ৯ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৭শে মাঘ ১৪৩২


নির্বাচন ঘিরে ভুয়া তথ্যের বন্যা, বেশিরভাগের উৎস ভারত

Jehad chowdhury

প্রকাশিত:৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭:২৫

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের ভোটাররা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার নির্বাচন করবেন। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, সমন্বিতভাবে ছড়ানো বিপুল পরিমাণ ভুয়া তথ্য ভোটারদের সিদ্ধান্তকে হুমকির মুখে ফেলছে। আর এই ভুয়া তথের বড় একটি অংশের উৎস প্রতিবেশী ভারত।

২০২৪ সালের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বাংলাদেশ। ওই আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হন শেখ হাসিনা; যিনি পরে প্রতিবেশী ভারতে পালিয়ে যান এবং তখন থেকে সেখানে হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকারের আশ্রয়ে রয়েছেন।

কর্তৃপক্ষ বলছে, অনলাইনে তথ্য বিকৃতির মাত্রা; বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি জটিল ছবি ও ভিডিও—এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠছে যে ভুয়া কনটেন্টের লাগাম টানতে একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করতে হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ও নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত জানুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্কের কাছে ভুয়া তথ্য ঠেকানোর বিষয়ে সহায়তা চেয়েছিলেন। সেই সময় তিনি বলেছিলেন, নির্বাচন ঘিরে ‘ভুয়া তথ্যের বন্যা’ দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘‌‘ভুয়া তথ্য বিদেশি গণমাধ্যম ও স্থানীয়—উভয় উৎস থেকে আসছে।’’

এই ভুয়া তথ্যের বড় একটি অংশ বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগকে ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশই অমুসলিম; যাদের বেশির ভাগ হিন্দু।

এর ফলে অনলাইনে ব্যাপক হারে দাবি করা হচ্ছে, হিন্দুরা হামলার শিকার হচ্ছেন। এ জন্য হিন্দু গণহত্যা (Hindu genocide) হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করা হচ্ছে।

গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত বাংলাদেশ পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৬৪৫টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশকে সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

• ভারত থেকে ভুয়া তথ্যের সমন্বিত প্রচার

যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেইট বলেছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে ‘‘হিন্দু গণহত্যা’’ দাবি করে করা ৭ লাখের বেশি পোস্ট শনাক্ত করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি অ্যাকাউন্ট থেকে এসব তথ্য ছড়ানো হয়েছে।

মার্কিন এই থিঙ্ক ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠানের প্রধান রাকিব নায়েক বলেন, ‘‘আমরা অনলাইনে ভারত থেকে পরিচালিত সমন্বিত ভুয়া তথ্যের প্রচার শনাক্ত করেছি; যেখানে বাংলাদেশের হিন্দুদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সহিংসতার মিথ্যা অভিযোগ তোলা হয়েছে।’’

ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, ‘‘এসব কনটেন্টের ৯০ শতাংশের বেশি এসেছে ভারত থেকে। বাকিগুলো যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় থাকা সংশ্লিষ্ট হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।’’

এএফপির ফ্যাক্ট চেক যেসব তথ্য যাচাই করে ভুয়া প্রমাণ করেছে, তার মধ্যে কিছু কিছু হাজার হাজার বার শেয়ার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এআই দিয়ে তৈরি একটি ভিডিও; যেখানে এক নারী—যার একটি হাত নেই; তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানান। অনেকেই এবারের নির্বাচনে বিএনপিকে এগিয়ে থাকা দল হিসেবে দেখছেন।

কম্পিউটার-নির্মিত আরেকটি ভিডিওতে এক হিন্দু নারী অভিযোগ করেন, একই ধর্মের মানুষদের দেশের প্রধান ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দিতে বলা হয়েছে; নতুবা তাদের ভারত পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

এএফপি ফ্যাক্ট চেক টিম ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে শত শত এআই ব্যবহার করে তৈরি করা ভিডিও শনাক্ত করেছে। এর বেশিরভাগ ভিডিওতেই এআই ব্যবহারের কোনও সতর্কীকরণ বার্তা লেখা হয়নি।

হাসিনার অধীনে বছরের পর বছর ধরে চলা দমন-পীড়নের পর এই উত্থান দেখা দিয়েছে, যখন বিরোধী দলকে দমন করা এবং স্পষ্টবাদী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

ঢাকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের প্রধান মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, অন্যান্য সময়ের তুলনায় আমরা এখন বিপুল পরিমাণ ভুয়া তথ্য লক্ষ্য করছি। তিনি বলেন, বিনামূল্যের এআই টুল সহজলভ্য হওয়ায় অত্যাধুনিক ভুয়া কনটেন্ট তৈরি করা অনেক সহজ হয়ে গেছে।

এআই দিয়ে তৈরি আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, কিছু বাংলাদেশি শেখ হাসিনার প্রশংসা করছেন; যিনি বর্তমানে পলাতক এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তার অনুপস্থতিতে মৃত্যুদণ্ডের সাজা ঘোষণা করা হয়েছে।

এদিকে, ভারতের ঘরোয়া আইপিএল লিগে খেলা বাংলাদেশি এক ক্রিকেটারকে ঘিরে দেশটির হিন্দুত্ববাদী কট্টরপন্থীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এর জেরে তার ক্লাব চুক্তি বাতিল করেছে। বাংলাদেশ জাতীয় দল চলতি মাসে ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোয় এই উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ভুয়া তথ্যের বড় অংশ ভারত থেকে এলেও এমন কোনও প্রমাণ নেই যে, এসব ব্যাপক আকারের অনলাইন পোস্ট সরকারি উদ্যোগে ছড়ানো হচ্ছে।

নয়াদিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা বাংলাদেশে ‘‘চরমপন্থীদের’’ দ্বারা সংখ্যালঘুদের ওপর ‘‘বারবার হামলার উদ্বেগজনক ঘটনা’ নথিভুক্ত করেছে। একই সঙ্গে নয়াদিল্লি জোর দিয়ে বলেছে, ‘‘আমরা সব সময়ই অবাধ, সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে আমাদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছি।’’

• বড় হুমকি

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র মো. রুহুল আমিন মল্লিক বলেন, তারা ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার সঙ্গে কাজ করছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ইউনিট গঠন করেছেন। তবে অনলাইনে বিপুল পরিমাণ কনটেন্ট মোকাবিলা করা একটি অন্তহীন কাজ।

তিনি বলেন, ‘‘আমাদের ইউনিট যদি কোনও কনটেন্টকে ক্ষতিকর ও বিভ্রান্তিকর হিসেবে শনাক্ত করে; তাহলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে সেটিকে ভুয়া তথ্য হিসেবে ঘোষণা করি।’’

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তা জেসমিন তুলি বলেন, এআই ব্যবহার করে তৈরি করা ছবি বাংলাদেশের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শহরের ৮০ শতাংশের বেশি পরিবারে অন্তত একটি স্মার্টফোন রয়েছে। আর গ্রামাঞ্চলেও এই হার প্রায় ৭০ শতাংশ। তবে অনেক মানুষই এখনও প্রযুক্তির ব্যবহারে তুলনামূলকভাবে নতুন।

তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য এটি বড় হুমকি। কারণ মানুষের মধ্যে তথ্য যাচাইয়ের সচেতনতা খুব বেশি নেই। এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া দৃশ্যের কারণে ভোটাররা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত হতে পারেন।’’

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়