সোমবার, ২৫শে মে ২০২৬, ১১ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো কারণে মানুষ মারা যাচ্ছে! রাস্তায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে বা পানিতে বা পারিবারিক রোষানলে পড়েসহ নানাভাবে। যখন একটি পরিবারের একজন সদস্যের প্রয়াণ হয় তখন এর মানে কি একজনেরই চলে যাওয়া?
পরিবারের বাকি সদস্য (ছোট/বড়), আত্মীয়-স্বজন বা নানা মাধ্যমে প্রকাশিত খবরটি যারা পাঠ করেন তাদের মনে মৃত্যু সংবাদটি কি কোনোভাবে প্রভাব ফেলে না? আবার একটি পরিবারের একাধিক সদস্য দুর্ঘটনার কবলে পড়ে মারা গেছেন এমন ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে! এগুলো কেবল সে পরিবারের জন্য নয় বরং মানবতাবোধ সম্পন্ন যেকোনো মানুষের জন্য হৃদয়বিদারক ঘটনা।
একাধিক সপ্তাহ ধরে পত্রিকায় প্রকাশিত হাম ও শিশু মৃত্যুজনিত খবরগুলো চোখে পড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করলেই সদ্য প্রয়াত শিশুদের মুখ ও তাদের জড়িয়ে ধরে বাবা-মায়ের কান্নার ছবি ও ভিডিওগুলো হৃদয়কে নাড়িয়ে দিচ্ছে!
প্রতিবারই ঘটে যাওয়া এমন ঘটনার দৃশ্য সামনে আসলেই আমি ভাবতে থাকি সেই অভিভাবক ও পরিবারের বাকি সদস্যদের ট্রমার মধ্য দিয়ে যাওয়া পরিস্থিতির কথা। একজন মানুষ হিসেবে আমি নিজেও ট্রমার ভেতর দিয়ে যাই। শিশুদের মুখগুলো ভুলতে পারি না। ওদের বাবা-মায়ের কান্নাও নিতে পারি না! আমি নিশ্চিত কেউই পারেন না।
আমি নিজে একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। শিশুদের খেলার জন্যেই এই প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণ করেছি। ঈদের ছুটির পর থেকেই সেন্টারে শিশুদের খেলতে আসার সংখ্যা বেশ কমে গেছে! খবর নিয়ে জানা গেছে ঋতুর পরিবর্তনজনিত নানা সমস্যার পাশাপাশি শিশুদের মায়েরা সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের মৃত্যুর কারণে আতঙ্কে ভুগছেন!
সেন্টারে খেলা করে দুই থেকে ৫/৬ বছরের শিশু। আগে অনেকেরই হয়তো টিকা দেওয়া আছে তবু তারা আতঙ্ক থেকে সরে আসতে পারছে না! এছাড়াও নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য কারণগুলো তো আছেই!
সেন্টারের শিশুরা যখন সর্দি বা জ্বরের কারণে আসে না তখন একটা সময় পর্যন্ত ওদের খেলা বন্ধ থাকে। বন্ধুদের সাথে কাটানো সময়ের মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে যে বিকাশ হওয়ার কথা সেগুলোর পথ তখন সংকীর্ণ হয়ে যায়! আর এটাই স্বাভাবিক!
আবার কয়েকদিনের অসুস্থতার পর যখন খেলতে আসে তখন ওরা থাকে প্রথমত শারীরিকভাবে দুর্বল। ওদের মায়েরা থাকেন একটু বেশিই অস্থির। শিশুদের আবার খেলায় মন ফেরানো, শেখার পরিবেশে মন ঘোরানো হয়ে পড়ে বেশ কঠিন! আর এটাও স্বাভাবিক।
এখন কথা হলো শিশুদের অসুস্থ হওয়া কি অস্বাভাবিক? না অস্বাভাবিক নয়। মানুষ হয়ে জন্ম নিলেই তাকে নানা রকমের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতেই হয়। আমরা সবাই গিয়েছি কিন্তু শিশুদের কোনো অসুখ যদি সমাজে আতঙ্কের মতো ছড়িয়ে পড়ে তাহলে বিষয়টি আর স্বাভাবিক থাকে না! এখানে তখন বেশকিছু প্রশ্ন চলে আসে; যেমন এখন যে প্রশ্ন সবার মনে, তা হলো হামের টিকা দেওয়া হয়নি কেন?
কেন শিশু হাসপাতালগুলো বা ডাক্তাররা এ বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক করেননি? কেন সরকার থেকে কোনো রকমের চাপ আসেনি? কেন এ বিষয়ে একজন স্বাস্থ্যকর্মীর কোনো আগাম সতর্কতা আমরা পেলাম না? কেন গণমাধ্যমে এ বিষয়গুলো ঘটনা ঘটে যাওয়ার আগেই প্রকাশিত হয়নি? কেন সমাজের একজন মানুষ জানলাম না যে, হামের টিকা দেওয়া হয়নি? কেন গণমাধ্যম এইরকম সেনসেটিভ বিষয়ে সঠিক ভূমিকা পালন করেনি?
হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়া নিয়ে সতর্কতা তৈরি, ডেঙ্গু নিয়ে সতর্কতা তৈরি বা সংক্রমনজনিত যেসব রোগ আছে, সেসব রোগ নিয়ে নিয়মিত আলোচনা বা প্রচারণা টেলিভিশনে, রেডিওতে, খবরের কাগজে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কি প্রচারিত হয়? বা কীভাবে হয়? এ বিষয়গুলো নজরে এনে কর্তৃপক্ষ সংবাদ মাধ্যমগুলোকে কি ঠিকঠাকভাবে কাজে লাগাতে পারছেন?
এমন প্রশ্নগুলোও কিন্তু মাথায় আসছে! এখানে বলে রাখা ভালো এ প্রশ্নগুলোর মধ্য দিয়ে সরকারকে হেয় করার কোনো উদ্দেশ্য নেই বরং সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা ভীষণ কৌতূহলী হয়ে উঠেছি এ সম্পর্কে জানতে! এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নিশ্চয়ই সতর্কতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে এবং একই সাথে সাধারণ মানুষকে জবাবদিহি করার কাজটিও করবে যা দিন শেষে আমাদের আতঙ্ক থেকে বের করে এনে হৃদয়কে করবে নির্ভার! আর এটার ভীষণ প্রয়োজন এ মুহূর্তে। সাধারণ মানুষ হিসেবে আমি উত্তর খুঁজছি। জবাব চাই।
একজন শৈশবকর্মী হিসেবে আমার কাজ শিশুদের নিয়েই। ওদের একদম চোখের সামনে থেকেই দেখছি প্রতিদিন। ওদের মায়েদের বা বাবাদের সাথে কথা হয়। সন্তান চোখের সামনে দিয়ে চলে যাবে এমন ট্রমা অভিভাবকদের জন্য নেওয়া দূরের কথা, ভাবাই তো এক রকমের ভয়ংকর ব্যাপার! কিন্তু স্কুল বন্ধ রাখলেই যে সমস্যার সমাধান হবে না সেটাও তো ওদের বোঝানো জরুরি!
সত্যি বলতে সেন্টারের পক্ষ থেকেই কাউন্সিলিং যথেষ্ট নয়। এ বিষয়ে নানা মিডিয়ায় তথ্য প্রকাশ করতে হবে। রোগ সম্পর্কিত কারণ, সতর্কতা, প্রতিষেধক, ওষুধের ওভার ডোজ বা সঠিক ডোজ, বাবা-মায়ের করণীয়সহ নানা বিষয় নিয়ে প্রতি সিজনেই নিয়ম করে তথ্য প্রকাশিত হতে হবে। রোগ ছড়িয়ে পরার পর মানুষকে সতর্ক করলে বড্ড দেরি হয়ে যায়!
শিশুদের জন্য বাবা-মা সবার আগে চায় একটা নিরাপদ পরিবেশ। শিশুদের বড় হওয়ার পথে প্রথম প্রয়োজনীয় উপাদান হলো অন্য শিশুদের সাথে মেলামেশার সুযোগ যার জন্য এলাকায় মাঠ থাকা ও সে মাঠে নিরাপদে খেলার সুযোগ থাকা জরুরি।
স্বাস্থ্যসম্মত খাবার যা ফরমালিন মুক্ত হওয়া চাই। অসুখ হলে সঠিক ডায়াগনোসিস, নির্ধারিত মাত্রায় ভেজাল মুক্ত ওষুধ সেবন, ডাক্তারের যথাযথ সহযোগিতা ভীষণভাবে জরুরি! আরও চাই সচেতন অভিভাবক। শিশুর বাবা ও মায়ের রোগ সম্পর্কে ও টিকা গ্রহণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা। এ সম্পর্কে গর্ভাবস্থায়ই অভিভাবকদের আগাম প্রস্তুতি গ্রহণের মধ্য দিয়ে সাহায্য করতে পারলে আরও ভালো হয়!
রোগ সম্পর্কে ধারণার পাশাপাশি আরও একটা বিষয় জরুরি সেটা হলো যেকোনো রোগ মহামারির আকার ধারণ করলে মনের অবস্থা নিয়েও যত্নশীল হওয়া। মনের যত্ন যেমন বাবা-মায়ের প্রয়োজন হয় ঠিক তেমনি প্রয়োজন হয় শিশুদের! ছোট শিশুদের মধ্যে কারও কাছের ভাই বা বোন চলে গেলে একজন খেলার সাথী চলে যায়। ওদের তখন সাথী চলে যাওয়ার কারণ আমরা কী বলি? কীভাবে বোঝাই? চারপাশের পরিবেশ তখন শিশুদের মনের মধ্যে কেমন প্রভাব ফেলে? ওরা মনে মনে অসুখ সম্পর্কে কী ভাবে?
অসুখ হওয়া মানেই মরে যাওয়া? দেশটা ভালো নয়! এ দেশ সম্পর্কে নানা রকমের হা-হুতাশ তখন শৈশব থেকে অভিভাবকদের কাছ থেকে শুনেই বড় হয় শিশুরা! এমন শৈশব তখন কেমন হয়? যেখানে শিশুরা দেশ ত্যাগের নানা রকমের প্রস্তুতি নিয়ে বড় হয়? ঠিক এ অবস্থায় দোষটা কার? এককভাবে কারও নাকি সবার?
আসলে আমাদের চাই সম্মিলিত উদ্যোগ, প্রচেষ্টা, আন্তরিকতা, সতর্কতা ও পদক্ষেপ। শিশুদের জন্য একটা চমৎকার ও নিরাপদ পরিবেশ দিতে না পারলে মন ভেঙে যাবে তাদের বাবা-মাদেরও! আর দিন শেষে বাবা-মা চায় সন্তানরা থাকুক দুধে-ভাতে।
একজন মানুষ সব কষ্ট সহ্য করতে পারে কিন্তু চোখের সামনে সন্তানের কষ্ট সহ্য করতে পারে না! সন্তান হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বলবে, ‘বাবা কোলে নাও। পানি দাও!’
সন্তান পরপারে চলে যাবে; এমন বেদনা নিয়ে বাবা-মা বেঁচে থাকবেন কী করে?
কঠিন। এমন ট্রমা চারপাশে দেখে বেঁচে থাকাটা বড় মানুষদের জন্যও কঠিন। আর যেসব শিশু ছোট বয়সে তারই মতো এক শিশুর হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া দেখে; তাদের জন্য একটা বিরাট প্রশ্ন! কেন চলে গেল? কোথায় গেল? কার কাছে গেল?
শিশু বয়সে মানুষ বেঁচে থাকার স্বপ্ন নিয়েই বড় হবে, একদিন আমিও চলে যাবো কিন্তু এমন আতঙ্ক নিয়ে নয়! কাজেই দেশটা আগামী প্রজন্মের জন্য একটা সুস্থ ও স্বাভাবিক পরিবেশ হয়ে উঠবে এমন আশায় বুক বেধেই আমরা সমাজের মানুষগুলো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যেতে চাই! পারি না?
ফারহানা মান্নান : প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী, শৈশব; শিক্ষা বিষয়ক গবেষক