বুধবার, ১৪ই জানুয়ারী ২০২৬, ১লা মাঘ ১৪৩২


যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বকাপ থেকে নিষিদ্ধ করার দাবি ব্রিটিশ সংসদ সদস্যদের


প্রকাশিত:
১৪ জানুয়ারী ২০২৬ ১৮:৩৪

আপডেট:
১৪ জানুয়ারী ২০২৬ ২০:৫২

বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রয়টার্স

২০২৬ বিশ্বকাপের বাঁশি বাজতে আর খুব বেশি দেরি নেই। কিন্তু মাঠের লড়াই শুরুর আগেই মাঠের বাইরের রাজনীতি যেন সব রোমাঞ্চ কেড়ে নিতে চাইছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ডে উত্তাল বিশ্বরাজনীতি, যার আঁচ এসে লেগেছে ফুটবলেও। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কারের দাবি তুলেছেন যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একদল সংসদ সদস্য।

ওই সংসদ সদস্যদের দাবি, আন্তর্জাতিক আইন আর অন্য দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান না দেখালে আমেরিকাকে ফুটবলের মহাযজ্ঞে রাখা চলবে না।

ঘটনার সূত্রপাত এ মাসে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে মার্কিন বাহিনীর এক ঝটিকা অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করার মধ্য দিয়ে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশের উদ্দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া একের পর এক হুঁশিয়ারি।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, আগামী আড়াই বছরে বিশ্বকাপ ও অলিম্পিক—দুই বড় আয়োজনই যখন যুক্তরাষ্ট্রে, তখন দেশটির পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব খেলাধুলার সংস্থাগুলোর ওপর কীভাবে পড়বে? কোনো সংস্থা কি আদৌ কঠোর অবস্থান নিতে পারে?

‘শান্তি পুরস্কার’ বনাম যুদ্ধের হুমকি
গত ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনে ২০২৬ বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ফিফা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তাদের প্রথম ‘শান্তি পুরস্কার’ দেয়। ফিফার ভাষ্য ছিল, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং শান্তি প্রচারে কাজ করেছেন।

কিন্তু এরপর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালিয়েছে ভেনেজুয়েলা ও নাইজেরিয়ায়। পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ড, বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক মেক্সিকো এবং বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া কলম্বিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধেও সম্ভাব্য অভিযানের ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প।

এ প্রেক্ষাপটে লেবার, লিবারেল ডেমোক্র্যাট, গ্রিন পার্টি ও প্লাইড কামরুর ২৩ জন এমপি সংসদে একটি প্রস্তাবে সই করেছেন। সেখানে বিশ্বকাপসহ বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বহিষ্কারের বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। ২৩ জন সংসদ সদস্য এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ‘বিশ্বকাপ বা অলিম্পিকের মতো বড় আসরকে কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের আইন লঙ্ঘনের হাতিয়ার হতে দেওয়া যায় না।’ তাঁদের মতে, একটি স্বাধীন দেশের প্রেসিডেন্টকে এভাবে তুলে নিয়ে আসা সরাসরি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।

যুক্তরাষ্ট্র কী করেছে, কী বলছে
এমপিদের এ প্রস্তাব নিয়ে এখনো বিবিসিকে কোনো মন্তব্য দেয়নি হোয়াইট হাউস। তবে এর আগে তারা দাবি করেছে, মাদুরোকে আটক করা ছিল একটি আইন প্রয়োগমূলক অভিযান। তাদের ভাষায়, মাদুরো একজন অবৈধ নেতা, যিনি মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জড়িত। ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ভেনেজুয়েলা ও দেশটির তেলশিল্পের নিয়ন্ত্রণ নেবে।

মাদুরো নিজেকে যুদ্ধবন্দী বলে দাবি করেছেন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে ট্রাম্পের এ পদক্ষেপ তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে ‘আন্তর্জাতিক আইনের নিয়ম মানা হয়নি—এ নিয়ে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’

এর মধ্যেই ট্রাম্প কিউবাকে সতর্ক করে বলেছেন, ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি নিয়ে ‘সময় থাকতে থাকতে চুক্তি করতে’। তিনি কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানকেও ‘ভালো ধারণা’ বলে মন্তব্য করেছেন।

ভেনেজুয়েলার মতো কলম্বিয়ার ক্ষেত্রেও ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, মাদক পাচার ঠেকাতে দেশটি যথেষ্ট কাজ করছে না। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো বিবিসিকে বলেছেন, তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের ‘বাস্তব হুমকি’ তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্প আরও বলেছেন, মেক্সিকো দিয়ে ‘ঢল নামিয়ে’ মাদক ঢুকছে যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের কিছু একটা করতেই হবে।’ এমন বক্তব্যের মধ্যেই মার্কিন সেনা পাঠানোর পরিকল্পনার খবরও সামনে এসেছে।

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম জানিয়েছেন, তিনি মেক্সিকোর মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক অভিযান প্রত্যাখ্যান করেছেন।

গ্রিনল্যান্ড নিয়েও ট্রাম্পের অবস্থান কড়া। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এ অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া দরকার বলে তিনি দাবি করেছেন। প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি। খনিজসমৃদ্ধ আর্কটিক অঞ্চলটি বর্তমানে ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণে। ডেনমার্ক ন্যাটোর সদস্য এবং প্লে-অফ পেরোলে বিশ্বকাপে খেলতেও পারে।

ফিফা ও অলিম্পিক কমিটির দ্বিমুখী নীতি
ইউক্রেনকে আক্রমণের দায়ে রাশিয়াকে নিষিদ্ধ করেছে ফিফা ও অলিম্পিক কমিটি। ব্রিটিশ এমপি ব্রায়ান লেইশম্যানের প্রশ্ন ঠিক এখানেই, ‘রাশিয়ার ক্ষেত্রে যে নিয়ম, আমেরিকার ক্ষেত্রে কেন নয়? একই নীতি থাকা উচিত।’

ফিফা অবশ্য মুখে কুলুপ এঁটেছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা কারও অজানা নয়। ফিফা ঘরোয়া আলোচনায় বলছে, তারা কোনো রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারে না। অলিম্পিক কমিটিও পরিষ্কার করে দিয়েছে, ইতালির শীতকালীন অলিম্পিকে মার্কিন অ্যাথলেটদের কোনোভাবেই আটকানো হবে না। তাদের মতে, অ্যাথলেটদের মিলনমেলাই বড় কথা, রাজনীতি তাদের আওতার বাইরে। বিবিসি স্পোর্টকে দেওয়া বিবৃতিতে আইওসি বলেছে, ‘একটি বৈশ্বিক সংস্থা হিসেবে আইওসিকে জটিল বাস্তবতার মধ্যে কাজ করতে হয়। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিশ্বের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আমাদের বিবেচনায় নিতে হয়।’
২০২৮ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবে অলিম্পিক।

সামনে বড় পরীক্ষা
কিছু বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করে ক্রীড়া সংস্থাগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের পরামর্শক জন জেরাফার ভাষায়, ‘ফিফা ও আইওসির সামনে এক বিশাল মাথাব্যথা অপেক্ষা করছে।’

বিবিসিকে জন জেরাফা বলেছেন, ‘দুই সংস্থার সনদেই শান্তি, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা ও বৈষম্যহীনতার কথা বলা আছে। রাশিয়ার ক্ষেত্রে সেই নীতিই নিষেধাজ্ঞা এনেছে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে যদি যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোভুক্ত ডেনমার্কের অধীন গ্রিনল্যান্ডে বল প্রয়োগ করে, তখন কি একই নীতি কার্যকর হবে? ডেনমার্ক যদি প্লে-অফ পেরিয়ে বিশ্বকাপে ওঠে, তারা কি বয়কট করবে? ইউরোপ বা ন্যাটো নেতারা কি যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত ইভেন্টে যেতে অস্বীকৃতি জানাবেন?’

১১ জুন শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতিও প্রভাব ফেলতে পারে।

ফিফা ও যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ একটি বন্ধুত্বপূর্ণ ও ঐক্যবদ্ধ টুর্নামেন্টের প্রতিশ্রুতি দিলেও ইরান, হাইতি, সেনেগাল ও আইভরি কোস্ট—এই চার দেশের সমর্থকেরা পূর্ণ বা আংশিক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ছেন।

শেষ পর্যন্ত রাজনীতির এই গোলমাল মাঠের ফুটবলকে ফিকে করে দেয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


রিসোর্সফুল পল্টন সিটি (১১ তলা) ৫১-৫১/এ, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
মোবাইল: ০১৭১১-৯৫০৫৬২, ০১৯১২-১৬৩৮২২
ইমেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক: মো. জেহাদ হোসেন চৌধুরী

রংধনু মিডিয়া লিমিটেড এর একটি প্রতিষ্ঠান।

Developed with by
Top